ইসলামি পরিভাষায় 'সহিফা' (বহুবচনে: সুহুফ) বলতে ছোট পুস্তিকা বা ছোট আসমানি কিতাবকে বোঝায়। মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের ওপর যে বাণীসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, তার মধ্যে যে কিতাবগুলো আকারে ছোট এবং নির্দিষ্ট কোনো জাতি বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমিত বিধান নিয়ে এসেছিল, সেগুলোই হলো সহিফা।
সহিফা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. আসমানি কিতাব ও সহিফার পার্থক্য
- আসমানি কিতাব (৪টি): এগুলো আকারে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী জীবনবিধান হিসেবে নাজিল হয়েছিল (তাওরাত, জাবুর, ইনজিল ও কুরআন)।
- সহিফা (১০০ বা ততোধিক): এগুলো ছোট পুস্তিকার মতো, যা বিশেষ বিশেষ নবীদের ওপর তাঁদের সময়ের প্রয়োজনে নাজিল হয়েছিল।
২. কতটি সহিফা নাজিল হয়েছিল?
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা.) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিস অনুযায়ী, মোট ১০০টি সহিফা নাজিল হয়েছিল (মতান্তরে ভিন্ন সংখ্যাও পাওয়া যায়)। এর বণ্টন ছিল নিম্নরূপ:
- হযরত আদম (আ.): ১০টি সহিফা।
- হযরত শীস (আ.): ৫০টি সহিফা (তিনি সবচেয়ে বেশি সহিফা পেয়েছিলেন)।
- হযরত ইদ্রিস (আ.): ৩০টি সহিফা।
- হযরত ইব্রাহিম (আ.): ১০টি সহিফা।
(উল্লেখ্য যে, কোনো কোনো বর্ণনা মতে হযরত মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত নাজিল হওয়ার আগে ১০টি সহিফা নাজিল হয়েছিল।)
৩. সহিফাসমূহের মূল বিষয়বস্তু
এই পুস্তিকাগুলোতে মূলত তিনটি প্রধান বিষয় আলোচিত হতো:
- তাওহীদ: আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত।
- উপদেশ ও প্রজ্ঞা: মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন ও সঠিক পথে চলার উপদেশ।
- আল্লাহর প্রশংসা: মহান স্রষ্টার মহিমা ও গুণকীর্তন।
৪. কুরআনে সহিফার উল্লেখ
পবিত্র কুরআনেও সহিফার অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। যেমন সূরা আল-আ'লা-তে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
"নিশ্চয়ই এটি পূর্ববর্তী সহিফাসমূহেও রয়েছে; ইব্রাহিম ও মুসার সহিফাসমূহে।" (সূরা আল-আ'লা, আয়াত: ১৮-১৯)
বর্তমানে এই সহিফাগুলোর মূল কপি বা লিখিত রূপ অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায় না, তবে এগুলোর মূল শিক্ষা এবং একেশ্বরবাদের বাণী পরবর্তী বড় কিতাবগুলোতে সংরক্ষিত হয়েছে।
হযরত আদম (আ.)-এর ওপর নাজিলকৃত ১০টি সহিফা বা ছোট পুস্তিকাগুলোতে মূলত তাওহীদ (একত্ববাদ), ইবাদত এবং মানবজীবনের প্রাথমিক পরিচালনা বিধি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামি বর্ণনা ও ইতিহাস অনুযায়ী এই সহিফাগুলোর প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু নিচে তুলে ধরা হলো:
সহিফার প্রধান ১০টি আলোচ্য বিষয়
১. আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহীদ): সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত এবং শিরক থেকে বাঁচার নির্দেশ।
২. ইবাদতের নিয়ম: মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কীভাবে তাসবিহ, জিকির এবং ইবাদত করতে হবে তার প্রাথমিক নির্দেশনা।
৩. হালাল ও হারামের বিধান: মানুষের জন্য কোন কোন খাদ্য ও কাজ বৈধ (হালাল) এবং কোনগুলো অবৈধ (হারাম), তার প্রথম ঘোষণা।
৪. শয়তানের প্রতারণা থেকে সতর্কতা: জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আসার প্রেক্ষাপটে ইবলিশ শয়তানের শত্রুতা এবং তার ধোঁকা থেকে বাঁচার উপায়।
৫. তওবা ও ক্ষমা: ভুল করার পর কীভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হয় এবং তওবার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা।
৬. পারিবারিক ও সামাজিক জীবন: প্রথম মানব হিসেবে পরিবার গঠন, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং সন্তানদের লালন-পালনের প্রাথমিক নিয়ম।
৭. সভ্যতার ভিত্তি: জীবন ধারণের জন্য কৃষি কাজ, ঘরবাড়ি তৈরি এবং পোশাক পরিধানের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়।
৮. আখিরাত ও বিচার দিবস: দুনিয়ার জীবনের পর পরকাল, জান্নাত এবং জাহান্নাম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা।
৯. সততা ও নৈতিকতা: মানুষের সাথে আচরণে সত্য বলা, আমানত রক্ষা করা এবং ভালো চরিত্রের গুরুত্ব।
১০. আল্লাহর গুণকীর্তন: বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করা।
দ্রষ্টব্য: অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং তাফসীর (যেমন- ইবনে কাসীর) অনুযায়ী বলা হয় যে, মহান আল্লাহ আদম (আ.)-এর ওপর ১০টি সহিফা নাজিল করেছিলেন। যদিও এগুলোর বিস্তারিত মূল পাঠ বর্তমানে অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায় না, তবে এর মূল বার্তা ছিল মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখানো।
@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।
Click Icon For Follow me সাবস্ক্রাইব করুন:
.png)
0 Comments