হুমায়ুন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ': মৌলবাদের কড়া সমালোচনা করায় তাকে শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল

 


হুমায়ুন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ': মৌলবাদের কড়া সমালোচনা করায় তাকে শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল

হুমায়ুন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' (২০০৪) উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত এবং সাহসী একটি সৃষ্টি এই উপন্যাসে তিনি উগ্র মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহারকে অত্যন্ত কঠোর তীক্ষ্ণ ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন

এই বইটির কারণে তাকে যে ধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

. মৌলবাদের ব্যবচ্ছেদ

উপন্যাসটিতে লেখক মৌলবাদী গোষ্ঠীর অমানবিক কর্মকাণ্ড, নারীবিদ্বেষ এবং তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেন তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্মের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা হয় তার এই আপসহীন লিখনশৈলী মৌলবাদী চক্রের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল

. প্রাণঘাতী আক্রমণ

বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে অমর একুশে বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় তার ওপর অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয় চাপাতি দিয়ে করা এই নৃশংস হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন

. বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত

হুমায়ুন আজাদের ওপর এই আক্রমণ ছিল মূলত মুক্তচিন্তা বাকস্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরার একটি অপপ্রয়াস তিনি আজীবন প্রথাগত সমাজব্যবস্থা এবং অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, আর এই উপন্যাসটি ছিল সেই লড়াইয়ের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ

. দেশত্যাগ মৃত্যু

শারীরিক আক্রমণের ক্ষত নিয়ে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য এবং গবেষণার কাজে জার্মানিতে পাড়ি জমান সেই আক্রমণের মাত্র কয়েক মাস পরেই, ১২ আগস্ট ২০০৪ সালে জার্মানির মিউনিখে তার রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে যদিও তার মৃত্যু নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে, তবে অনেকের মতেই সেই নৃশংস শারীরিক আক্রমণের ধকল তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি


হুমায়ুন আজাদকে বলা হয় 'প্রথাধিকৃত' বা প্রথা ভাঙার কারিগর তার এই উপন্যাস এবং তার পরবর্তী পরিণতি আজও বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ইতিহাসে একটি শোকাবহ অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়

হুমায়ুন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাসের প্রধান চরিত্র এবং এর শৈল্পিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে এই উপন্যাসের গভীরতা আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব:

প্রধান চরিত্র: জিবরিল

এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো জিবরিল, যাকে লেখক একজন ধর্মীয় উগ্রপন্থী এবং অন্ধ আনুগত্যকারী হিসেবে চিত্রিত করেছেন

মানসিকতা: জিবরিল এমন এক ব্যক্তি, যে মনে করে তার বিশ্বাসই একমাত্র ধ্রুব সত্য এবং এর বাইরে যারা আছে তারা সবাই 'কাফের' বা ধ্বংসযোগ্য

নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি: জিবরিলের মাধ্যমে লেখক মৌলবাদী গোষ্ঠীর নারীবিদ্বেষী মনোভাব ফুটিয়ে তুলেছেন তার কাছে নারী কেবল ভোগের বস্তু বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য সত্তা

রূপান্তর: উপন্যাসের একপর্যায়ে জিবরিলের ভেতরে এক ধরণের দোটানা বা মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়, যা অন্ধবিশ্বাসের বিপরীতে মানবতার সামান্যতম স্ফুলিঙ্গকে নির্দেশ করে

উপন্যাসের শৈল্পিক কাঠামোগত দিক

. তীক্ষ্ণ আক্রমণাত্মক ভাষা (Satire):

হুমায়ুন আজাদ তার চিরাচরিত ধারালো এবং ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় উপন্যাসটি লিখেছেন তিনি রূপক বা প্রতীকের আড়ালে না গিয়ে সরাসরি আক্রমণ করেছেন তার বাক্য গঠন ছিল ছোট কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী, যা পাঠককে ভাবাতে বাধ্য করে

. অ্যান্টি-হিরো বা খলনায়কের জবানবন্দি:

সাধারণত উপন্যাসে নায়ক বা পজিটিভ চরিত্রের জয়গান গাওয়া হয় কিন্তু এখানে লেখক একজন উগ্রপন্থীর চোখ দিয়ে পুরো সমাজ তার কর্মকাণ্ডকে দেখিয়েছেন এটি একটি নেতিবাচক চরিত্রের 'ফার্স্ট পারসন ন্যারেটিভ', যা বাংলা সাহিত্যে বেশ বিরল

. পরাবাস্তবতা বীভৎসতা:

উপন্যাসে উগ্রবাদীদের ট্রেনিং, তাদের গোপন আস্তানা এবং তাদের নৃশংসতাকে এত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে তা অনেক সময় বীভৎস মনে হতে পারে লেখক বাস্তবতাকে অত্যন্ত নগ্নভাবে উপস্থাপন করেছেন যাতে মৌলবাদের প্রকৃত চেহারা ঢাকা না পড়ে

. প্রতীকি নাম শিরোনাম:

উপন্যাসের শিরোনামটি পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম চরণ থেকে নেওয়া এটি মূলত দেশভাগের সময়কার দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং তার পরবর্তী সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের দিকে ইঙ্গিত করে


হুমায়ুন আজাদের এই সৃষ্টি কেবল একটি গল্প নয়, এটি ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরণের 'প্রোটেস্ট' বা প্রতিবাদ

হুমায়ুন আজাদের 'রাজনীতিবিদগণ' (১৯৯১) উপন্যাসটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ এই উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আদর্শহীন রাজনীতি, ক্ষমতার লোভ এবং সুবিধাবাদ একটি দেশ সমাজকে ভেতর থেকে নষ্ট করে ফেলে

উপন্যাসটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে দেওয়া হলো:

. রাজনীতির বিকৃত রূপ

এই উপন্যাসে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, বরং একটি 'পলিটিক্যাল ক্লাস' বা রাজনৈতিক শ্রেণিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে রাজনীতির নামে ভণ্ডামি, তোষামোদি এবং অর্থ উপার্জনের নেশা প্রধান হয়ে ওঠে

. চরিত্রায়ন ব্যঙ্গ (Satire)

হুমায়ুন আজাদ এখানে অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে চরিত্রগুলো নির্মাণ করেছেন নেতা, পাতি-নেতা এবং চামচাদের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ক্ষেত্রে সমান্তরালভাবে সত্য

. সাধারণ মানুষের অবস্থান

রাজনীতিবিদদের এই ক্ষমতার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ কীভাবে কেবল দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত থাকে, লেখক সেই রূঢ় বাস্তবতা এখানে তুলে ধরেছেন


হুমায়ুন আজাদের কিছু বিখ্যাত সাহসী উদ্ধৃতি

তার লিখনশৈলী যেমন ছিল প্রখর, তেমনি তার উক্তিসমূহ ছিল সমাজ প্রথার প্রতি এক একটি চপেটাঘাত যেমন:

"আজাদ হতে হলে আগে তোমাকে তোমার শেকলগুলোকে চিনতে হবে"

(এটি তার মুক্তচিন্তার দর্শনের একটি মূল ভিত্তি)

"আমাদের দেশে সেই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক, যে সবচেয়ে বড় চোর"

(রাজনৈতিক দুর্নীতি দেশপ্রেমের ভণ্ডামির প্রতি তার এক চরম ক্ষোভ এই উক্তিতে প্রকাশ পায়)


হুমায়ুন আজাদ কেবল একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দ্রোহী ভাষাবিদ এবং সমাজচিন্তক তার 'ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল' উপন্যাসটিও রাজনৈতিক সামাজিক অবক্ষয়ের এক অনন্য দলিল

 

 


Post a Comment

0 Comments