হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ওপর: ১০টি সহিফা নাজিল

 



হযরত ইব্রাহিম (.)-এর ওপর: ১০টি সহিফা নাজিল

 

ইসলামি পরিভাষায় 'সহিফা' (বহুবচনে: সুহুফ) বলতে ছোট পুস্তিকা বা ছোট আসমানি কিতাবকে বোঝায় মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের ওপর যে বাণীসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, তার মধ্যে যে কিতাবগুলো আকারে ছোট এবং নির্দিষ্ট কোনো জাতি বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমিত বিধান নিয়ে এসেছিল, সেগুলোই হলো সহিফা

সহিফা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

. আসমানি কিতাব সহিফার পার্থক্য

·         আসমানি কিতাব (৪টি): এগুলো আকারে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী জীবনবিধান হিসেবে নাজিল হয়েছিল (তাওরাত, জাবুর, ইনজিল কুরআন)

·         সহিফা (১০০ বা ততোধিক): এগুলো ছোট পুস্তিকার মতো, যা বিশেষ বিশেষ নবীদের ওপর তাঁদের সময়ের প্রয়োজনে নাজিল হয়েছিল


. কতটি সহিফা নাজিল হয়েছিল?

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা.) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিস অনুযায়ী, মোট ১০০টি সহিফা নাজিল হয়েছিল (মতান্তরে ভিন্ন সংখ্যাও পাওয়া যায়) এর বণ্টন ছিল নিম্নরূপ:

·         হযরত আদম (.): ১০টি সহিফা

·         হযরত শীস (.): ৫০টি সহিফা (তিনি সবচেয়ে বেশি সহিফা পেয়েছিলেন)

·         হযরত ইদ্রিস (.): ৩০টি সহিফা

·         হযরত ইব্রাহিম (.): ১০টি সহিফা

(উল্লেখ্য যে, কোনো কোনো বর্ণনা মতে হযরত মুসা (.)-এর ওপর তাওরাত নাজিল হওয়ার আগে ১০টি সহিফা নাজিল হয়েছিল।)


. সহিফাসমূহের মূল বিষয়বস্তু

এই পুস্তিকাগুলোতে মূলত তিনটি প্রধান বিষয় আলোচিত হতো:

·         তাওহীদ: আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত

·         উপদেশ প্রজ্ঞা: মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন সঠিক পথে চলার উপদেশ

·         আল্লাহর প্রশংসা: মহান স্রষ্টার মহিমা গুণকীর্তন


. কুরআনে সহিফার উল্লেখ

পবিত্র কুরআনেও সহিফার অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। যেমন সূরা আল-'লা-তে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

"নিশ্চয়ই এটি পূর্ববর্তী সহিফাসমূহেও রয়েছে; ইব্রাহিম মুসার সহিফাসমূহে।" (সূরা আল-'লা, আয়াত: ১৮-১৯)

বর্তমানে এই সহিফাগুলোর মূল কপি বা লিখিত রূপ অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায় না, তবে এগুলোর মূল শিক্ষা এবং একেশ্বরবাদের বাণী পরবর্তী বড় কিতাবগুলোতে সংরক্ষিত হয়েছে

হযরত ইব্রাহিম (.)-এর ওপর আল্লাহ তাআলা যে ১০টি সহিফা নাজিল করেছিলেন, সেগুলোর মূল বিষয়বস্তু এবং প্রাপ্ত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

ইসলামি ঐতিহ্য হাদিসের বর্ণনা (যেমন: মুসনাদে আহমদ) অনুযায়ী, এই সহিফাগুলো মূলত উপদেশ, প্রজ্ঞা এবং আল্লাহর একত্ববাদের (তাওহীদ) বর্ণনায় পূর্ণ ছিল। তবে এই সহিফাগুলোর নির্দিষ্ট আলাদা আলাদা নাম বা শিরোনাম বর্তমানে কিতাব আকারে সংরক্ষিত নেই

এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

·         তাওহীদ ইমান: আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর মহিমা ঘোষণা

·         উত্তম চরিত্র: মানুষের আচরণ নৈতিকতা সংশোধনের দিকনির্দেশনা

·         আখেরাত: পরকাল এবং জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে সতর্কবার্তা

·         বিবেচনা প্রজ্ঞা: বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে উপদেশ

একটি হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই সহিফাগুলোতে নিম্নোক্ত ৪টি বিশেষ উপদেশের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়:

. বিবেচনা বোধ: একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত তার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা। . সময়ের মূল্যায়ন: নিজের সময় সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং আমল করা। . পরিকল্পনা: নিজের কাজের জন্য সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা। . আত্মসমালোচনা: পরকালের হিসাবের আগে দুনিয়াতে নিজের কাজের হিসাব নেওয়া

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আলা (আয়াত ১৮-১৯) এবং সূরা আন-নাজম (আয়াত ৩৬-৩৭)- এই সহিফার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, এতে পূর্ববর্তী নবীদের ওপর নাজিলকৃত চিরন্তন সত্যগুলোই লিপিবদ্ধ ছিল

পবিত্র কুরআনের যে দুটি সূরায় হযরত ইব্রাহিম (.)-এর সহিফার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তার তাফসির মূল শিক্ষাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

. সূরা আল-আলা (আয়াত ১৮-১৯)

"নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহেও ছিল; ইব্রাহিম মুসার সহিফাসমূহে।"

তাফসিরের সারসংক্ষেপ:

·         চিরন্তন সত্য: মুফাসসিরগণের মতে, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়েছেন যে, সূরা আল-আলায় বর্ণিত মৌলিক বিষয়গুলো (যেমন: পরকাল উত্তম হওয়া, দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা এবং আত্মশুদ্ধি) নতুন কিছু নয়। এগুলো ইব্রাহিম (.) মুসা (.)-এর ওপর নাজিলকৃত সহিফাতেও বিদ্যমান ছিল

·         ঐক্যমত: এটি প্রমাণ করে যে, যুগে যুগে সব নবীর দাওয়াত মূল আকিদা একই ছিল

. সূরা আন-নাজম (আয়াত ৩৬-৩৭)

"তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মুসার সহিফাতে? এবং ইব্রাহিমের সহিফাতে, যে (তার দায়িত্ব) পূর্ণ করেছিল?"

তাফসিরের সারসংক্ষেপ:

·         ইব্রাহিম (.)-এর আনুগত্য: এখানে আল্লাহ ইব্রাহিম (.)-এর প্রশংসা করেছেন কারণ তিনি তাঁর ওপর অর্পিত প্রতিটি আদেশ পরীক্ষা (যেমন: অগ্নিপরীক্ষা, সন্তান কোরবানি) পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করেছিলেন

·         মূল শিক্ষা: এই সূরার পরের আয়াতগুলোতে (৩৮-৪৪) সহিফার মূল বার্তাগুলো সংক্ষেপে দেওয়া হয়েছে:

o    ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: একজনের পাপের বোঝা অন্যজন বহন করবে না

o    শ্রমের ফল: মানুষ তা- পায় যা সে করার চেষ্টা করে

o    বিচার: মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব কিয়ামতের দিন সূক্ষ্মভাবে নেওয়া হবে

সহিফার মূল উপদেশসমূহ (হাদিসের আলোকে)

হযরত আবু জর গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে এসেছে যে, ইব্রাহিম (.)-এর সহিফাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল:

1.     শাসকের কর্তব্য: রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রজাদের প্রতি ইনসাফ জুলুমমুক্ত শাসনের নির্দেশ

2.     সময়ের বণ্টন: একজন বুদ্ধিমান মুমিন তার সময়কে চার ভাগে ভাগ করবে— () আল্লাহর ইবাদত, () নিজের হিসাব নেওয়া, () আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা এবং () হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা

3.     জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ: অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা

হযরত ইব্রাহিম (.)-এর সহিফা সম্পর্কে তাফসিরে ইবনে কাসির এবং মাআরেফুল কুরআন-এর আলোকে আরবী উদ্ধৃতিসহ একটি বিস্তারিত সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:

. আরবী উদ্ধৃতি মূল ভিত্তি (Arabic Context)

তাফসিরবিদগণ বিশেষ করে ইমাম ইবনে কাসির (.) এবং মুফতি শফী (.) একটি দীর্ঘ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন যা হযরত আবু জর গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত:

قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا كَانَتْ صُحُفُ إِبْرَاهِيمَ؟ قَالَ: "كَانَتْ أَمْثَالاً كُلُّهَا: أَيُّهَا الْمَلِكُ الْمُسَلَّطُ الْمُبْتَلَى الْمَغْرُورُ، إِنِّي لَمْ أَبْعَثْكَ لِتَجْمَعَ الدُّنْيَا بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ، وَلَكِنْ بَعَثْتُكَ لِتَرُدَّ عَنِّي دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، فَإِنِّي لَا أَرُدُّهَا وَلَوْ كَانَتْ مِنْ كَافِرٍ..."

. তাফসিরে ইবনে কাসির (Tafsir Ibn Kathir) - সারসংক্ষেপ

ইবনে কাসির (.) সূরা আল-আলা এবং সূরা আন-নাজমের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, ইব্রাহিম (.)-এর সহিফাগুলো মূলত হিকমত (প্রজ্ঞা) উপদেশে ভরপুর ছিল

·         শাসকদের প্রতি সতর্কবার্তা: আল্লাহ জালিম শাসককে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "আমি তোমাকে দুনিয়া জমানোর জন্য ক্ষমতা দেইনি, বরং মজলুমের আর্তনাদ শোনার জন্য পাঠিয়েছি। কারণ মজলুম কাফের হলেও আমি তার দোয়া ফিরিয়ে দেই না।"

·         বুদ্ধিমান ব্যক্তির গুণাবলি: একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সে তার সময়কে গুরুত্ব দেয় এবং নিজের জিহ্বার হেফাজত করে

·         আমলের বিনিময়: সূরা আন-নাজমের তাফসিরে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সহিফাতে লেখা ছিল— "মানুষ যা চেষ্টা করে, তা- সে পায়।"


. মাআরেফুল কুরআন (Ma'ariful Quran) - বিস্তারিত নোট

মুফতি মুহাম্মদ শফী (.) তাঁর তাফসিরে ইব্রাহিম (.)-এর সহিফাতে বর্ণিত তিনটি মূল সময়ের বণ্টনের কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন:

একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত তার দিনকে ৪টি ভাগে ভাগ করা (হাদিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী যা সহিফায় ছিল):

1.     مناجاة ربه (মুনাজাতু রাব্বিহি): একভাগ সময় আল্লাহর সাথে কথোপকথন বা ইবাদতে ব্যয় করা

2.     محاسبة نفسه (মুহাসাবাতু নাফসিহি): একভাগ সময় নিজের সারাদিনের কাজের হিসাব নেওয়া (আত্মসমালোচনা)

3.     التفكر في صنع الله (আত-তাফাক্কুর ফী সুন'ইল্লাহ): একভাগ সময় আল্লাহর সৃষ্টিজগত নিয়ে গবেষণা চিন্তা করা

4.     لحاجته من المطعم والمشرب (লি-হাজাতিহি): একভাগ সময় নিজের জীবিকা অর্জন প্রয়োজনীয় পানাহারের জন্য রাখা

সহিফার অন্যতম বড় শিক্ষা (বাংলা সারমর্ম):

মুমিন ব্যক্তি কেবল তিনটি উদ্দেশ্যে সফর বা পরিশ্রম করবে:

·         পরকালের পাথেয় সংগ্রহের জন্য

·         জীবিকা নির্বাহের জন্য

·         হারাম নয় এমন কোনো আনন্দ বা প্রশান্তির জন্য


. সূরা আল-আলা- সাথে সম্পর্ক

মাআরেফুল কুরআনে বলা হয়েছে, সূরা আল-আলার শেষ আয়াতগুলোতে যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে (যেমন: দুনিয়ার জীবনের চেয়ে আখেরাতই শ্রেষ্ঠ), তা ইব্রাহিম (.)-এর সহিফারও মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ

(বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখেরাতই অধিকতর শ্রেষ্ঠ স্থায়ী।)

 @আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

 Click Icon For Follow me সাবস্ক্রাইব করুন



Click Topics and Read Thank you visit again 


Post a Comment

0 Comments