হযরত ইদ্রিস (আ.)-এর ওপর: ৩০টি সহিফা নাজিল

 


হযরত ইদ্রিস (আ.)-এর ওপর: ৩০টি সহিফা নাজিল

ইসলামি পরিভাষায় 'সহিফা' (বহুবচনে: সুহুফ) বলতে ছোট পুস্তিকা বা ছোট আসমানি কিতাবকে বোঝায় মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের ওপর যে বাণীসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, তার মধ্যে যে কিতাবগুলো আকারে ছোট এবং নির্দিষ্ট কোনো জাতি বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমিত বিধান নিয়ে এসেছিল, সেগুলোই হলো সহিফা

সহিফা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

. আসমানি কিতাব সহিফার পার্থক্য

·         আসমানি কিতাব (৪টি): এগুলো আকারে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী জীবনবিধান হিসেবে নাজিল হয়েছিল (তাওরাত, জাবুর, ইনজিল কুরআন)

·         সহিফা (১০০ বা ততোধিক): এগুলো ছোট পুস্তিকার মতো, যা বিশেষ বিশেষ নবীদের ওপর তাঁদের সময়ের প্রয়োজনে নাজিল হয়েছিল


. কতটি সহিফা নাজিল হয়েছিল?

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা.) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিস অনুযায়ী, মোট ১০০টি সহিফা নাজিল হয়েছিল (মতান্তরে ভিন্ন সংখ্যাও পাওয়া যায়) এর বণ্টন ছিল নিম্নরূপ:

·         হযরত আদম (.): ১০টি সহিফা

·         হযরত শীস (.): ৫০টি সহিফা (তিনি সবচেয়ে বেশি সহিফা পেয়েছিলেন)

·         হযরত ইদ্রিস (.): ৩০টি সহিফা

·         হযরত ইব্রাহিম (.): ১০টি সহিফা

(উল্লেখ্য যে, কোনো কোনো বর্ণনা মতে হযরত মুসা (.)-এর ওপর তাওরাত নাজিল হওয়ার আগে ১০টি সহিফা নাজিল হয়েছিল।)


. সহিফাসমূহের মূল বিষয়বস্তু

এই পুস্তিকাগুলোতে মূলত তিনটি প্রধান বিষয় আলোচিত হতো:

·         তাওহীদ: আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত

·         উপদেশ প্রজ্ঞা: মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন সঠিক পথে চলার উপদেশ

·         আল্লাহর প্রশংসা: মহান স্রষ্টার মহিমা গুণকীর্তন


. কুরআনে সহিফার উল্লেখ

পবিত্র কুরআনেও সহিফার অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। যেমন সূরা আল-'লা-তে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

"নিশ্চয়ই এটি পূর্ববর্তী সহিফাসমূহেও রয়েছে; ইব্রাহিম মুসার সহিফাসমূহে।" (সূরা আল-'লা, আয়াত: ১৮-১৯)

বর্তমানে এই সহিফাগুলোর মূল কপি বা লিখিত রূপ অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায় না, তবে এগুলোর মূল শিক্ষা এবং একেশ্বরবাদের বাণী পরবর্তী বড় কিতাবগুলোতে সংরক্ষিত হয়েছে

হযরত ইদ্রিস (.)-এর ওপর অবতীর্ণ ৩০টি সহিফা বা ক্ষুদ্র পুস্তিকা সম্পর্কে ইসলামি ইতিহাস তাফসিরের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

সহিফার সংখ্যা প্রেক্ষাপট

ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন নবীদের ওপর কিতাব সহিফা নাজিল করেছেন। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ তাআলা মোট ১০৪টি আসমানি কিতাব নাজিল করেছিলেন। এর মধ্যে হযরত ইদ্রিস (.)-এর ওপর ৩০টি সহিফা অবতীর্ণ হয়


সহিফাগুলোর মূল আলোচ্য বিষয়

যদিও এই সহিফাগুলোর বর্তমান কোনো পাণ্ডুলিপি বা হুবহু টেক্সট সংরক্ষিত নেই, তবে বিভিন্ন বর্ণনা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে এর মূল শিক্ষাগুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়:

·         একেশ্বরবাদ (তাওহীদ): পূর্ববর্তী সকল সহিফার মতো এখানেও মূল ভিত্তি ছিল মহান আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর ইবাদতের দাওয়াত

·         তাকওয়া পবিত্রতা: মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর ভয়ে জীবন অতিবাহিত করার দিকনির্দেশনা ছিল এতে

·         জ্যোতির্বিদ্যা বিজ্ঞান: ইদ্রিস (.)-কে বলা হয় 'প্রথম শিক্ষক' ধারণা করা হয়, এই সহিফাগুলোতে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি, গণিত এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রাথমিক কিছু আধ্যাত্মিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত ছিল

·         লিখন পদ্ধতি শিল্প: তিনিই প্রথম কলম দিয়ে লিখেছিলেন। তাই এই সহিফাগুলো মানবসভ্যতায় লিখন সংরক্ষণের সূচনা হিসেবে বিবেচিত

·         পোশাক সভ্যতা: চামড়ার পরিবর্তে কাপড় সেলাই করে পরিধান করার শিক্ষা এবং উন্নত জীবনযাত্রার নিয়মকানুন এই সহিফাগুলোতে আলোচিত ছিল বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন


হযরত ইদ্রিস (.)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য

ইদ্রিস (.)-এর ওপর নাজিলকৃত এই সহিফাগুলোর প্রভাব তাঁর কাজের মাধ্যমে ফুটে উঠত:

1.     প্রথম কলম ব্যবহারকারী: তিনি কলমের মাধ্যমে সহিফার জ্ঞান লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন

2.     শরিয়তের প্রবর্তন: সমকালীন গোত্রগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচার কায়েম এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার নিয়মাবলী এসব সহিফায় বর্ণিত ছিল

3.     আকাশে উত্তরণ: কুরআনের সূরা মারিয়ামে (আয়াত ৫৬-৫৭) তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, "আমি তাকে উচ্চ আসনে উন্নীত করেছি।" অনেক মুফাসসির মনে করেন, তাঁর প্রাপ্ত ইলম আমলের কারণেই তাঁকে এই মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল


সারসংক্ষেপে, হযরত ইদ্রিস (.)-এর ৩০টি সহিফা ছিল তৎকালীন মানবসমাজের জন্য ধর্মীয় জীবন বিধান এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটি সংমিশ্রণ। এটি কেবল ইবাদতের নিয়মই শেখায়নি, বরং মানুষকে কলম ধরা এবং জ্ঞানচর্চার পথেও পরিচালিত করেছিল

হযরত ইদ্রিস (.)-এর জীবনের বেশ কিছু অলৌকিক এবং শিক্ষণীয় ঘটনা রয়েছে যা ইতিহাস তাফসিরের কিতাবগুলোতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে আপনি চাইলে নিচের যেকোনো একটি বিষয়ে আলোচনা করতে পারি:


. জান্নাত জাহান্নাম ভ্রমণ

ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ইদ্রিস (.) জীবদ্দশায় জান্নাত জাহান্নাম দেখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। মহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে আজরাইল (.) তাঁকে এই দুই স্থান পরিভ্রমণ করান। তাঁর জান্নাতে প্রবেশ এবং সেখানে থেকে যাওয়ার ঘটনাটি বেশ চমৎকার

. প্রথম কলম বস্ত্র শিল্পের উদ্ভাবন

ইতিহাসবিদদের মতে, হযরত ইদ্রিস (.)- প্রথম ব্যক্তি যিনি মহান আল্লাহর প্রদত্ত জ্ঞানে কলম দিয়ে লেখার সূচনা করেন। এর আগে মানুষ চামড়া বা পাথরে চিহ্ন রাখত। এছাড়াও, তিনিই প্রথম সেলাই করা কাপড়ের পোশাক তৈরি করেনএর আগে মানুষ পশুর চামড়া পরিধান করত

. জ্যোতির্বিজ্ঞান গণিত

অনেক মুফাসসিরের মতে, নক্ষত্রের অবস্থান, সময়ের গণনা এবং গণিতশাস্ত্রের অনেক মৌলিক জ্ঞান আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওহীর মাধ্যমে শিখিয়েছিলেন, যা তিনি তাঁর উম্মতদের মাঝে প্রচার করেন

. তাঁর ইন্তেকাল আকাশে উত্তোলন

কুরআনের আয়াত "আমি তাঁকে উচ্চাসনে উন্নীত করেছি" (সূরা মারিয়াম: ৫৭)-এর ব্যাখ্যায় অনেক নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় যে, তিনি চতুর্থ আসমানে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে রয়েছেন

হযরত ইদ্রিস (.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত

হযরত ইদ্রিস (.) ছিলেন মানব ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যাকে আল্লাহ তাআলা জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতার এক বিশেষ স্তরে উন্নীত করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে তাঁর কথা অত্যন্ত সস্মানের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে

. বংশ পরিচয় নবুওয়াত

হযরত আদম (.) এবং হযরত শীস (.)-এর পর তিনি ছিলেন তৃতীয় নবী। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর আসল নাম ছিল আখনুখ (Enoch) তিনি প্রচুর পড়াশোনা জ্ঞানচর্চা করতেন বলে তাঁকে ইদ্রিস (যিনি পাঠ দান করেন) উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি তৎকালীন বাবেলে (ব্যাবিলন) জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে মিশরে হিজরত করেন

. প্রথম শিক্ষক উদ্ভাবক হিসেবে অবদান

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে ইদ্রিস (.)-এর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁকে প্রথম শিক্ষক বলা হয় কারণ:

·         লিখন পদ্ধতি: তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি কলম তৈরি করেন এবং তা দিয়ে লেখার সূচনা করেন

·         বস্ত্র শিল্প: তাঁর আগে মানুষ পশুর চামড়া পরিধান করত। তিনি প্রথম সুঁই-সুতা দিয়ে কাপড় সেলাই করে পোশাক তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেন

·         জ্যোতির্বিজ্ঞান গণিত: নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ এবং সময়ের হিসাব রাখার প্রাথমিক জ্ঞান তিনি ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছিলেন

·         নগর পরিকল্পনা: কথিত আছে, তিনি তাঁর সময়ে প্রায় ১০০টিরও বেশি শহর বা জনপদ পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে তুলেছিলেন

. আসমানি কিতাব শিক্ষা

হযরত ইদ্রিস (.)-এর ওপর আল্লাহ তাআলা ৩০টি সহিফা নাজিল করেছিলেন। তাঁর প্রচারের মূল বিষয় ছিল:

·         আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহীদ)

·         পরকালীন জবাবদিহিতা

·         মিথ্যা অবিচার থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা

·         যুগোপযোগী জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা

. অলৌকিক ঘটনা জান্নাত ভ্রমণ

ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, ইদ্রিস (.) জান্নাত জাহান্নামের স্বরূপ দেখতে চেয়েছিলেন। মহান আল্লাহর আদেশে হযরত আজরাইল (.) তাঁকে এই দুই স্থান পরিভ্রমণ করান। জান্নাতের সৌন্দর্য দেখার পর তিনি সেখানে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং আল্লাহর বিশেষ রহমতে তিনি সেখানেই অবস্থান গ্রহণ করেন

. কুরআনে তাঁর মর্যাদা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:

"এবং এই কিতাবে ইদ্রিসের কথা স্মরণ করুন, তিনি ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ নবী। আর আমি তাঁকে উচ্চাসনে উন্নীত করেছি।" (সূরা মারিয়াম: ৫৬-৫৭)

অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এই 'উচ্চাসন' মানে হলো চতুর্থ আসমান, যেখানে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে মিরাজের ঘটনায় উল্লেখ পাওয়া যায়


উপসংহার

হযরত ইদ্রিস (.) কেবল একজন ধর্ম প্রচারকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আধুনিক মানব সভ্যতার ভিত্তি স্থাপনকারী এক মহান সংস্কারক। জ্ঞান প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার যে আল্লাহর ইবাদতেরই অংশ, তাঁর জীবন থেকে আমরা সেই শিক্ষাই পাই

@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

 Click Icon For Follow me সাবস্ক্রাইব করুন



Click Topics and Read Thank you visit again 

Post a Comment

0 Comments