রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্ক : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্যবাদ: তার 'পুতুলনাচের ইতিকথা' বা 'পদ্মানদীর মাঝি'র পরের দিকের লেখায় যখন মার্ক্সবাদ প্রবল হয়ে ওঠে, তখন তার শৈল্পিক মান নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনে মার্ক্সীয় আদর্শের অনুপ্রবেশ এবং তার শৈল্পিক মানের বিবর্তন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এক বিতর্কের বিষয়। এই রূপান্তরকে মূলত দুটি পর্বে ভাগ করে আলোচনা করা যায়: 'ফ্রয়েডীয় অবচেতনতত্ত্ব' থেকে 'মার্ক্সীয় বস্তুবাদ'।
১. পটভূমি ও আদর্শিক রূপান্তর
'পুতুলনাচের ইতিকথা' (১৯৩৬) বা 'পদ্মানদীর মাঝি' (১৯৩৬) রচনার সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মূলত মানুষের অবচেতন মন, জৈবিক তাড়না এবং নিয়তিবাদের রূপকার। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে (বিশেষ করে ১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণের পর) তার লেখায় শ্রেণীসংগ্রাম ও সাম্যবাদী আদর্শ প্রধান হয়ে ওঠে।
২. শৈল্পিক মান নিয়ে বিতর্কের মূল পয়েন্টসমূহ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী পর্যায়ের সাহিত্য (যেমন: 'চিহ্ন', 'মাঝি', 'সোনার পুতলি') নিয়ে সমালোচকদের প্রধান আপত্তিগুলো ছিল নিম্নরূপ:
প্রচারধর্মিতা বনাম শিল্পগুণ: সমালোচকদের মতে, পরবর্তী লেখায় মানিক শিল্পী অপেক্ষা 'প্রোপাগান্ডিস্ট' বা প্রচারক হিসেবে বেশি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। গল্পের স্বতঃস্ফূর্ত গতির চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা শিল্পমানকে কিছুটা ক্ষুণ্ণ করেছিল বলে অনেকে মনে করেন।
চরিত্রের যান্ত্রিকতা: শুরুর দিকের শশী ('পুতুলনাচের ইতিকথা') বা কুবেরের ('পদ্মানদীর মাঝি') মধ্যে যে রক্ত-মাংসের জটিলতা ছিল, পরবর্তী অনেক চরিত্রে তার অভাব দেখা যায়। চরিত্রগুলো অনেক সময় শ্রেণীসংগ্রামের এক-একটি 'টাইপ' বা প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
নিয়তিবাদ থেকে যুক্তিবাদ: মানিক প্রথম জীবনে মানুষকে 'পুতুল' হিসেবে দেখেছিলেন যাকে চালনা করে অদৃষ্ট বা জৈবিক কামনা। কিন্তু মার্ক্সবাদে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি মানুষকে ইতিহাসের নির্মাতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এই আমূল পরিবর্তন অনেক পাঠক ও সমালোচকের কাছে আকস্মিক ও শিল্পবিচ্যুত মনে হয়েছিল।
৩. ভিন্ন মত: শিল্পের নতুন দিগন্ত
তবে সকল সমালোচক এই অবনতির তত্ত্ব মেনে নেননি। প্রগতিশীল সমালোচকদের মতে:
মানিক কেবল রোমান্টিকতা বর্জন করেছিলেন। তার 'হারানের নাতজামাই' বা 'ছোটবকুলপুরের যাত্রী'র মতো গল্পে শোষিত মানুষের যে বলিষ্ঠ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন বাস্তববাদের জন্ম দেয়।
মধ্যবিত্ত জীবনের ড্রয়িংরুম থেকে সাহিত্যকে তিনি আক্ষরিক অর্থেই কলকারখানা এবং সাধারণ মানুষের মিছিলে নিয়ে গিয়েছিলেন।
উপসংহার
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পমান পড়ে গিয়েছিল নাকি দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছিল, তা আজও তাত্ত্বিক বিতর্কের বিষয়। তবে এটি সত্য যে, তিনি সচেতনভাবেই 'শিল্পের জন্য শিল্প' (Art for
Art's sake) নীতি ত্যাগ করে 'মানুষের জন্য শিল্প' এবং 'বিপ্লবের জন্য শিল্প'কে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এমনকি তার চরম দুঃসময়ে লেখা রোগজীর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলোতেও যে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ছিল, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অতুলনীয়।

0 Comments