স্বামীর আত্মীয়দের প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব এবং সীমা: যৌথ পরিবারে পারস্পরিক সম্মানের বিধান।সম্পর্কে কোরআনের বানী :
আসসালামুয়ালাইকুম মোমেনগন 🙋♂️🙋♂️🙋♂️ পবিত্র অল্ কোরাআন কেবল মাত্র ধর্ম গ্রন্থ নয়। বিশ্ব মানব কল্যাণে উৎকৃষ্ট আধ্যাত্মিক পরিপুরক গ্রন্থ। পবিত্র “রমজান মাসে অল্ কোরআনের সাথে” অর্থ না বুঝে কেবল মাত্র আরবি উচ্চারণ আর নয় চলুন আরবি উচ্চারণের পাশাপাশি বাংলা অর্থ বুঝার ও আমল করার চেষ্টা করি :
যৌথ পরিবারে স্বামী, স্ত্রী এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা একটি ইবাদত। ইসলামে পারিবারিক কাঠামোর ভিত্তি হলো পারস্পরিক দয়া, শ্রদ্ধা এবং অধিকারের সচেতনতা। স্বামীর আত্মীয়দের প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব এবং সীমানা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইসলামের মূল মূলনীতি: দয়া ও উত্তম আচরণ
ইসলামে স্বামীর পিতা-মাতা (শাশুড়ি-শ্বশুর) বা আত্মীয়দের সেবা করা স্ত্রীর ওপর আইনত ‘ফরজ’ বা বাধ্যতামূলক করা হয়নি, তবে এটি 'ইহসান' বা উত্তম চরিত্রের অংশ। একজন মুসলিম হিসেবে বড়দের সম্মান করা এবং আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
অর্থ: "এবং তোমরা মানুষের সাথে সদালাপ (সুন্দর ব্যবহার) করো।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৮৩)
২. শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা ও সম্মান
স্বামীর বাবা-মা স্ত্রীর কাছে নিজের বাবা-মায়ের মতোই সম্মানের পাত্র। যদিও তাদের সরাসরি সেবা করা স্ত্রীর ওপর বাধ্যতামূলক নয়, তবুও স্বামীর সন্তুষ্টি এবং পারিবারিক শান্তির জন্য তাদের দেখাশোনা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এটি স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসারই একটি বহিঃপ্রকাশ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُعَرِّفْ شَرَفَ كَبِيرِنَا
অর্থ: "সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান (মর্যাদা) জানে না।" (সুনানে তিরমিজি)
৩. স্ত্রীর সীমানা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy)
যৌথ পরিবারে থাকলেও ইসলাম স্ত্রীকে নিজস্ব গোপনীয়তা এবং স্বাচ্ছন্দ্যের অধিকার দিয়েছে। দেবর, ভাসুর বা অন্যান্য পরপুরুষের সামনে পর্দার বিধান মেনে চলা অপরিহার্য।
পর্দার বিধান: স্বামীর ভাইদের (দেবর/ভাসুর) সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে ইসলাম কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমরা মহিলাদের নিকট প্রবেশ করা থেকে বেঁচে থাকো।" এক আনসারী সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! 'হামউ' (স্বামীর আত্মীয় যেমন দেবর/ভাসুর) সম্পর্কে আপনার মতামত কী? তিনি বললেন: الْحَمْوُ الْمَوْتُ (হামউ বা দেবর-ভাসুর তো মৃত্যু সমতুল্য)। (সহিহ বুখারি)
এর অর্থ হলো, এদের সাথে নির্জনে অবস্থান বা অতিরিক্ত মেলামেশা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং তা থেকে দূরে থাকা উচিত।
৪. পারস্পরিক সম্মানের বিধান ও ভারসাম্য
একটি সুখী যৌথ পরিবারের জন্য উভয় পক্ষকে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হয়:
স্ত্রীর অধিকার: স্ত্রীর আলাদা থাকা বা খাওয়ার অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। যদি যৌথ পরিবারে থাকা কষ্টসাধ্য হয়, তবে স্বামী তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে আলাদা কামরা বা ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে বাধ্য।
ধৈর্য ধারণ: ছোটখাটো ভুলত্রুটি এড়িয়ে চলা এবং ধৈর্য ধরা ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
অর্থ: "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবন অতিবাহিত করো।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৯)
সংক্ষেপে করণীয়:
সম্মান প্রদর্শন: শাশুড়িকে মায়ের মতো এবং শ্বশুরকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করা।
সহযোগিতা: ঘরের কাজে সামর্থ্য অনুযায়ী শাশুড়িকে সাহায্য করা।
পর্দা রক্ষা: দেবর ও ভাসুরদের থেকে শরয়ি দূরত্ব বজায় রাখা।
স্বামীর আনুগত্য: আল্লাহর অবাধ্যতা না হয়—এমন সব বিষয়ে স্বামীর কথা মেনে চলা এবং তার আত্মীয়দের সম্মান করা।
যৌথ পরিবারে ইসলামের এই ভারসাম্যপূর্ণ বিধান মেনে চললে পরিবারটি জান্নাতের বাগানে পরিণত হতে পারে। একটি সুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ যৌথ পরিবার গঠনে ইসলাম যে সামাজিক শিষ্টাচার ও মনস্তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তা অত্যন্ত কার্যকর। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস এবং বাস্তবসম্মত সামাজিক টিপস তুলে ধরা হলো:
১. কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস (সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে)
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু মূলনীতি শিখিয়েছেন:
সালামের প্রসার: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা সালামের প্রসার করো, তবেই তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।" (সহিহ মুসলিম)। শ্বশুরবাড়ির সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা এবং নিয়মিত সালাম দেওয়া সম্পর্কের জড়তা কাটিয়ে দেয়।
উপহার আদান-প্রদান: হাদিসে এসেছে, "তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, তবে তোমাদের মধ্যে মহব্বত (ভালোবাসা) বাড়বে।" (আল-আদাবুল মুফরাদ)। মাঝেমধ্যে শাশুড়ি বা ননদদের ছোটখাটো উপহার দেওয়া সম্পর্কের গভীরতা বাড়ায়।
দোষ গোপন রাখা: নবীজী (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।" (সহিহ মুসলিম)। যৌথ পরিবারের সদস্যদের ভুলত্রুটি বা অভ্যন্তরীণ কথা বাইরের কারো কাছে (এমনকি নিজের বাবার বাড়িতেও) না বলা একটি বড় গুণ।
২. সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক টিপস
যৌথ পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে নিচের কৌশলগুলো বেশ কার্যকর হতে পারে:
অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ: বিয়ের পর নতুন পরিবেশে গিয়েই সব পরিবর্তন করতে চাবেন না। অন্তত ৩-৬ মাস সময় নিন সেখানকার রীতিনীতি বুঝতে। সবার মেজাজ ও পছন্দ-অপছন্দ বুঝতে পারলে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
স্বামীর ওপর চাপ না দেওয়া: স্বামী যেন তার মা-বাবা এবং স্ত্রীর অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারেন, সেদিকে খেয়াল রাখুন। তাকে সরাসরি তার পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ না দিয়ে সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করুন।
ব্যক্তিগত সীমানা (Boundaries) রক্ষা: ইসলাম শাশুড়ি বা ননদকে 'মা' বা 'বোন' হিসেবে সম্মান করতে বলেছে, কিন্তু তারা আপনার ব্যক্তিগত শয়নকক্ষ বা ব্যক্তিগত বিষয়ে সবসময় হস্তক্ষেপ করবে—এমনটা নয়। বুদ্ধিমত্তার সাথে এবং নম্রভাবে নিজের প্রাইভেসি রক্ষা করুন।
কাজের প্রশংসা: শাশুড়ি বা পরিবারের অন্য বড়রা যদি কোনো ভালো কাজ করেন, তবে মন খুলে প্রশংসা করুন। এটি তাদের আপনার প্রতি ইতিবাচক করে তুলবে।
তর্ক এড়িয়ে চলা: কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য হলে সেই মুহূর্তে তর্ক না করে চুপ থাকা ভালো। পরে শান্ত অবস্থায় নিজের যুক্তি বুঝিয়ে বললে তা বেশি কার্যকর হয়।
৩. একটি বিশেষ বিধান: স্বামীর আত্মীয়দের সাথে পর্দা
যৌথ পরিবারে একটি সাধারণ ভুল হলো দেবর বা ভাসুরের সাথে সাধারণ ভাইবোনের মতো মেলামেশা করা। ইসলাম এখানে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে:
দেবর বা ভাসুরের সামনে ঢিলেঢালা পোশাক ও মাথায় ওড়না রাখা আবশ্যক।
অপ্রয়োজনে তাদের সাথে দীর্ঘ সময় আড্ডা দেওয়া বা হাসি-ঠাট্টা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এটি কেবল ধর্মীয় বিধানই নয়, বরং দাম্পত্য জীবনে অহেতুক সন্দেহ ও অশান্তি এড়ানোরও একটি মাধ্যম।
৪. স্বামীর আত্মীয়দের প্রতি অধিকারের সীমা
মনে রাখা জরুরি যে, ইসলাম অনুযায়ী আপনার ওপর কেবল আপনার স্বামীর অধিকার এবং আপনার নিজের মা-বাবার সেবা করার দায়িত্ব প্রাথমিক। তবে স্বামীর আত্মীয়দের প্রতি সদয় হওয়া আপনার 'আখলাক' বা উন্নত চরিত্রের পরিচয়। এটি কোনো আইনি বোঝা নয়, বরং একটি নৈতিক বিনিয়োগ যা পরকালে আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।
তফসীর বা অর্থ প্রকাশে যদি কোনো ভ্রান্তি থাকে জানান আমার আগ্রহ জানার। ভালো লাগলে অবশ্য আমাকে ফ্লো করুন। লাইক-শেয়ার-কমেন্ট করুন পড়ার জন্য ধন্যবাদ। নিজে জানুন আমল করুন ও অপর কে শেয়ার করে জানানোর ব্যবস্থা করলে সাওয়াবের কাজ। আল্লাহ হাফিজ।। আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐পাঁশকুড়া।। মুসলিম সমাজের সমস্যা ও সমাধানে আল্লাহর বিধান প্রতি দিন 10 টি পোস্ট রমজান মাসের এই কটি দিন সবাই মিলে আমল করার চেষ্টা করি।। আল্লাহ আমাদের কে ইসলামের বিধানের মধ্যে কার্যকর থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন,,

0 Comments