রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্ক : নবারুণ ভট্টাচার্য: তার 'কাঙাল মালসাট' বা 'হারবার্ট'-এর ভাষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ঘৃণা অনেককেই অস্বস্তিতে ফেলে
নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্য মানেই প্রচলিত মধ্যবিত্ত শ্লীলতা, গাম্ভীর্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত। তাঁর 'হারবার্ট' বা 'কাঙাল মালসাট'-এর ভাষা এবং রাজনৈতিক আদর্শিক অবস্থান বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই অস্বস্তি কেন তৈরি হয়, তা কয়েকটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:
১. লুম্পেন প্রলেতারিয়েত ও উপভাষার আস্ফালন
সাধারণত বাংলা সাহিত্যে একটি মার্জিত ‘ভদ্রলোক’ ভাষার চল রয়েছে। নবারুণ সেটাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।
রাস্তার ভাষা: 'কাঙাল মালসাট' বা 'হারবার্ট'-এ তিনি ব্যবহার করেছেন চোলাইয়ের আড্ডা, বস্তি বা খিদিরপুরের ডকের ভাষা। এই ভাষায় গালিগালাজ কোনো অলঙ্কার নয়, বরং তা ব্যবস্থার প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।
অস্বস্তির কারণ: তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ যখন দেখেন তাদের সযত্নে লালিত ভাষার পবিত্রতা নবারুণের কলমে ধুলোয় মিশছে, তখন তারা সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সংকটে ভোগেন।
২. ফ্যান্টাসি ও ম্যাজিক রিয়ালিজমের রাজনৈতিক ব্যবহার
নবারুণ বাস্তবকে দেখার জন্য পরাবাস্তবতা বা ফ্যান্টাসিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
চণ্ডাল ও ফ্যাতাড়ু: 'কাঙাল মালসাট'-এ 'ফ্যাতাড়ু' বা 'চোঙাড়ু'দের মতো চরিত্রগুলো কোনো অতিমানবীয় নায়ক নয়, বরং সমাজের প্রান্তিক ও ব্রাত্য মানুষ। তারা উড়তে পারে, তারা মন্ত্র দিয়ে ট্রেন থামিয়ে দিতে পারে।
প্রতিষ্ঠান বিরোধী বিদ্রোহ: তাদের এই অদ্ভুত ক্ষমতাগুলো আসলে রাষ্ট্রের আইন এবং শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এক ধরণের 'সাবোটাজ'। যা রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাকেই তারা ভয় পায়।
৩. মৃত্যু ও পচনের নান্দনিকতা
'হারবার্ট' উপন্যাসে হারবার্টের জীবন ও মৃত্যুকে নবারুণ যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা প্রথাগত বিয়োগান্তক কাহিনীর চেয়ে আলাদা।
মৃতদের সাথে কথা বলা বা আত্মহত্যার পর বিস্ফোরণের মাধ্যমে হারবার্ট প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের তুচ্ছ জীবনও ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে।
পচন, দুর্গন্ধ এবং কদর্যতাকে তিনি যেভাবে উদযাপিত করেছেন, তা সুন্দরের পূজারী পাঠকদের কাছে চরম অস্বস্তিকর।
৪. বামপন্থী রাজনীতির সমালোচনা ও নৈরাজ্যবাদ
নবারুণ নিজেকে বামপন্থী মনে করলেও সংসদীয় বামপন্থা বা সুবিধাবাদী রাজনীতির কড়া সমালোচক ছিলেন।
তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের মুখপত্র না হয়ে বরং শোষিত মানুষের 'নৈরাজ্যবাদ'
(Anarchism)-কে তুলে ধরেছেন।
তাঁর মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না হচ্ছে, ততক্ষণ 'ঘৃণা' বা 'প্রতিশোধ'ই হলো প্রতিবাদের প্রধান ভাষা। এই আপোষহীন অবস্থান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও তাঁকে বিতর্কিত করে তুলেছে।
নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্যিক দর্শনে চরিত্রগুলো শুধু রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং এক একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির তীব্র প্রতীক। বিশেষ করে 'ফ্যাতাড়ু' এবং 'হারবার্ট'—এই দুই ধরনের চরিত্রের রাজনৈতিক প্রতীকায়ন নিয়ে গভীর আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
নিচে এদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ফ্যাতাড়ু: লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের চরম বিদ্রোহ
ফ্যাতাড়ুরা (যেমন মদন, ডি.এস ইত্যাদি) কোনো সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, তারা আসলে সমাজের 'ব্রাত্য' বা 'উচ্ছিষ্ট' অংশ।
নৈরাজ্যবাদ
(Anarchism): ফ্যাতাড়ুরা কোনো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাস করে না। তারা উড়তে পারে এবং উপর থেকে মানুষের গায়ে 'বিষ্ঠা' ত্যাগ করে। এটি আসলে মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি এবং রাষ্ট্রের গাম্ভীর্যের মুখে থুতু ছিটানোর একটি মেটাফোর।
অস্ত্র হিসেবে শরীর: তাদের কাছে বন্দুক বা বোমা নেই, আছে উড়তে পারার ক্ষমতা। এটি প্রতীকায়িত করে যে, যখন সাধারণ মানুষের আর হারাবার কিছু থাকে না, তখন তাদের অস্তিত্বই রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
প্রান্তিক মানুষের জয়গান: যারা ড্রেনের পাশে থাকে, চোলাই খায় এবং তথাকথিত 'ভদ্র' সমাজের বাইরে—নবারুণ তাদের হাতেই নাশকতার ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন। এটি এক ধরণের রাজনৈতিক কল্পনা যেখানে নিচুতলার মানুষ উপরতলার শৃঙ্খলা ভেঙে দেয়।
২. হারবার্ট: ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে গণ-বিস্ফোরণ
'হারবার্ট' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হারবার্ট সরকার একাকী, অদ্ভুত এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু তার রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
বিস্মৃত ইতিহাস: হারবার্ট মৃতদের সাথে কথা বলে। এটি প্রতীকী অর্থে বোঝায় যে, রাষ্ট্র বা ইতিহাস যাদের ভুলে যেতে চায়, নবারুণ তাদের ফিরিয়ে আনতে চান। হারবার্টের মাধ্যমে তিনি অতীতের বিপ্লবীদের (যেমন নকশালবাড়ী আন্দোলনের শহীদদের) স্মৃতির ওপর আলো ফেলেন।
মৃত্যু যখন প্রতিবাদ: হারবার্টের মৃত্যু কোনো সাধারণ আত্মহত্যা নয়। সে মারা যাওয়ার সময় ডিনামাইট দিয়ে ঘর উড়িয়ে দেয়। এটি একটি চরম রাজনৈতিক প্রতীক—যেখানে একজন মানুষ তিলে তিলে অপমানিত হতে হতে শেষে নিজেকে এক মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত করে।
বুর্জোয়া বিজ্ঞানের পরাজয়: হারবার্টের অতিলৌকিক কর্মকাণ্ডকে যখন 'যৌক্তিক' বা 'বৈজ্ঞানিক' ব্যাখ্যা দিয়ে আটকানো যায় না, তখন তা আসলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
৩. চণ্ডাল ও অন্যান্য চরিত্র
নবারুণের কাহিনীতে শ্মশানের চণ্ডাল বা ডোমদের উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে খুবই সচেতন। তারা সমাজ কাঠামোর সবচেয়ে নিচের স্তরে থেকেও জীবনের চরম সত্য (মৃত্যু) নিয়ন্ত্রণ করে। নবারুণ বোঝাতে চেয়েছেন, যে সমাজ এদের অস্পৃশ্য করে রেখেছে, দিনশেষে সেই সমাজকে এদের হাতেই সমর্পিত হতে হয়।
উপসংহার
নবারুণ ভট্টাচার্য সচেতনভাবেই তাঁর পাঠকদের স্বস্তিতে থাকতে দিতে চাননি। তাঁর ভাষা কেবল শব্দ নয়, বরং তা একটি রাজনৈতিক বিবৃতি। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সাহিত্য মানে কেবল আনন্দ বা শিক্ষা নয়, সাহিত্য মানে কখনও কখনও ব্যবস্থার মুখে সজোরে থাপ্পড় মারা।

0 Comments