মহাভারতের বনপর্ব : ঋষিদের বর্ণিত বিখ্যাত উপাখ্যান : ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির কাহিনী: মহর্ষি বিভাণ্ডকের পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গের তপোবন ত্যাগ ও অঙ্গরাজ্যে বৃষ্টি আনা
ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির কাহিনী ভারতীয় পুরাণের এক অনন্য উপাখ্যান, যা মহাভারতের বনপর্বে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। আপনার আলোচনার সূত্র ধরে এই মুনির জীবন ও তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কিছু বিশেষ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য
ঋষ্যশৃঙ্গ ছিলেন মহর্ষি বিভাণ্ডকের পুত্র। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, তাঁর জন্ম হয়েছিল এক হরিণীর গর্ভে। জন্মের সময় তাঁর কপালে একটি মৃগ বা হরিণের মতো শৃঙ্গ (শিং) ছিল, যার ফলে তাঁর নাম হয় 'ঋষ্যশৃঙ্গ'।
২. তপোবনের একাকী জীবন
পিতা বিভাণ্ডক মুনি তাঁকে বাইরের জগতের ছোঁয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছিলেন। তিনি বনের গভীরে কেবল তাঁর পিতার সঙ্গেই বড় হয়েছিলেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি যৌবনকাল পর্যন্ত কোনো নারী দেখেননি এবং জানতেনও না যে পৃথিবীতে পিতা ছাড়া অন্য কোনো মানুষ বা নারী জাতি আছে।
৩. অঙ্গরাজ্যের খরা ও ঋষ্যশৃঙ্গ
অঙ্গরাজ্যের রাজা লোমপাদ (যিনি রাজা দশরথের পরম বন্ধু ছিলেন) একবার ব্রহ্মশাপের ফলে তাঁর রাজ্যে ভয়াবহ অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হন। ঋষিরা নিদান দেন যে, যদি পরম পবিত্র ও আজন্ম ব্রহ্মচারী ঋষ্যশৃঙ্গকে রাজ্যে আনা যায়, তবেই বৃষ্টি হবে।
৪. বারাঙ্গনাদের কৌশল ও তপোবন ত্যাগ
ঋষ্যশৃঙ্গকে তপোবন থেকে আনা সহজ ছিল না, কারণ বিভাণ্ডক মুনি অত্যন্ত ক্রোধী ছিলেন। রাজা লোমপাদ চতুর বারাঙ্গনাদের (গণিকা) পাঠান ঋষ্যশৃঙ্গকে মুগ্ধ করে নিয়ে আসার জন্য।
·
তাঁরা বনের গভীরে গিয়ে ঋষ্যশৃঙ্গকে মিষ্টি ফল ও সুগন্ধি দ্রব্য দিয়ে প্রলুব্ধ করেন।
·
সরলমনা ঋষ্যশৃঙ্গ তাঁদের 'বিচিত্র তপস্বী' ভেবে ভুল করেন এবং তাঁদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত নৌকাযোগে অঙ্গরাজ্যে পৌঁছান।
৫. অলৌকিক বৃষ্টি ও বিবাহ
মহাভারতে বর্ণিত আছে যে, ঋষ্যশৃঙ্গ অঙ্গরাজ্যের সীমানায় পা রাখা মাত্রই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়। প্রজারা রক্ষা পায়। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রাজা লোমপাদ তাঁর পালিত কন্যা শান্তার (যিনি আসলে রাজা দশরথের কন্যা ছিলেন) সাথে ঋষ্যশৃঙ্গের বিবাহ দেন।
৬. রামায়ণের সাথে সংযোগ
এই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির গুরুত্ব কেবল বৃষ্টি আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরবর্তীতে অযোধ্যার রাজা দশরথ যখন পুত্রহীন ছিলেন, তখন এই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিই 'পুত্রকামেষ্টি যজ্ঞ' পরিচালনা করেছিলেন। এই যজ্ঞের প্রসাদ খেয়েই দশরথের তিন রানি গর্ভবতী হন এবং শ্রীরামচন্দ্রসহ চার ভাইয়ের জন্ম হয়।
মহাভারতের বনপর্বে মহর্ষি লোমশ যুধিষ্ঠিরকে তীর্থযাত্রার মাহাত্ম্য বর্ণনার সময় ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির এই চমৎকার উপাখ্যানটি শুনিয়েছিলেন। এই কাহিনীটি যেমন কৌতূহলপূর্ণ, তেমনই এর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম।
নিচে আপনার উল্লেখ করা এই কাহিনীর প্রধান পর্যায়গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির পরিচয় ও কঠোর তপোবন জীবন
মহর্ষি বিভাণ্ডক ছিলেন এক প্রচণ্ড তেজস্বী ঋষি। তিনি একদা নদীর তীরে তপস্যা করার সময় দেবীরূপী এক উর্বশীকে দেখে বিচলিত হন, যার ফলে তাঁর বীর্য জলে পতিত হয় এবং এক মৃগী (হরিণী) তা পান করে গর্ভবতী হয়। সেই মৃগীর গর্ভেই ঋষ্যশৃঙ্গের জন্ম।
·
বৈশিষ্ট্য: তাঁর মাথায় একটি মৃগের মতো শৃঙ্গ (শিং) ছিল, তাই তাঁর নাম হয় 'ঋষ্যশৃঙ্গ'।
·
তপোবন জীবন: পিতা বিভাণ্ডক তাঁকে বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রেখে বড় করেছিলেন। তিনি কখনও নারী দেখেননি, এমনকি ব্রহ্মচর্য পালনের বাইরে পৃথিবীর অন্য কোনো আনন্দ সম্পর্কে তাঁর বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না।
২. অঙ্গরাজ্যের সংকট ও দশরথের চিন্তা
সে সময় অঙ্গরাজ্যের রাজা ছিলেন লোমপাদ (বা কোনো কোনো মতে দশরথের মিত্র)। তাঁর রাজ্যে টানা বারো বছর অনাবৃষ্টির ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রাজজ্যোতিষীরা বিধান দেন যে, যদি পরম পবিত্র ও নিষ্পাপ ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে রাজ্যে আনা যায়, তবেই ইন্দ্রদেব তুষ্ট হয়ে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন।
৩. তপোবন ত্যাগ: বারাঙ্গনাদের কৌশল
বিপক্ষ পরিস্থিতির কথা ভেবে রাজা চতুর বারাঙ্গনাদের (গণিকাদের) পাঠালেন ঋষ্যশৃঙ্গকে ভুলিয়ে নিয়ে আসার জন্য। বিভাণ্ডক ঋষি যখন আশ্রমে ছিলেন না, তখন বারাঙ্গনারা সেখানে পৌঁছান।
·
ঋষ্যশৃঙ্গ তাঁদের দেখে মনে করেছিলেন তাঁরাও হয়তো কোনো বিচিত্র 'তপস্বী'।
·
তাঁদের দেওয়া সুস্বাদু ফল এবং মিষ্টি ব্যবহার ঋষ্যশৃঙ্গকে মুগ্ধ করে। পিতা ফিরে আসার আগেই তিনি তাঁদের নৌকায় চড়ে অঙ্গরাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এটিই ছিল তাঁর তপোবন ত্যাগের সেই বিখ্যাত মুহূর্ত।
৪. অঙ্গরাজ্যে আগমন ও অলৌকিক বৃষ্টি
ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি যখনই অঙ্গরাজ্যের সীমানায় পা রাখলেন, অমনি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠলো এবং প্রবল বর্ষণ শুরু হলো। তপ্ত ধরণী শান্ত হলো এবং দুর্ভিক্ষ দূর হলো। রাজা লোমপাদ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁর কন্যা শান্তাকে ঋষ্যশৃঙ্গের সাথে বিবাহ দেন।
৫. মহর্ষি বিভাণ্ডকের ক্রোধ ও প্রশান্তি
পরবর্তীতে মহর্ষি বিভাণ্ডক তাঁর পুত্রকে খুঁজতে খুঁজতে অঙ্গরাজ্যে আসেন। প্রথমে তিনি ক্রুদ্ধ হলেও রাজার বিনয় এবং পুত্রের সুখে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের আশীর্বাদ করেন।
একটি আকর্ষণীয় তথ্য: এই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিই পরবর্তীতে রাজা দশরথের জন্য 'পুত্রকামেষ্টি যজ্ঞ' সম্পন্ন করেছিলেন, যার ফলে রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্নর জন্ম হয়।

0 Comments