মহাভারতের আঠারোটি পর্বের মধ্যে ভীষ্মপর্ব ষষ্ঠ
মহাভারতের আঠারোটি পর্বের মধ্যে ভীষ্মপর্ব ষষ্ঠ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এই পর্বেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রথাগত সূচনা এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অমৃতবাণী বর্ণিত হয়েছে।
আপনার অনুরোধ অনুযায়ী ভীষ্মপর্বের মূল কাহিনীগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
ভীষ্মপর্বের প্রধান ঘটনাবলি
·
উভয়পক্ষের প্রস্তুতি: কুরুক্ষেত্রের ময়দানে পাণ্ডব ও কৌরব বাহিনীর বিন্যাস এবং যুদ্ধের কঠোর নিয়মাবলী নির্ধারণ।
·
সঞ্জয়কে দিব্যদৃষ্টি দান: মহর্ষি ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রের সারথি সঞ্জয়কে 'দিব্যদৃষ্টি' প্রদান করেন যাতে তিনি প্রাসাদে বসেই যুদ্ধের সমস্ত ঘটনা দেখতে পান।
·
ভূ-সংস্থান বর্ণনা: সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের কাছে জম্বুদ্বীপ ও পৃথিবীর মানচিত্র বর্ণনা করেন।
·
অর্জুনের বিষাদ: যুদ্ধের শুরুতে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও গুরুজনদের বিপক্ষে দেখে অর্জুন মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং অস্ত্র ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
·
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: অর্জুনের বিষাদ দূর করতে এবং তাঁকে স্বধর্মে উদ্বুদ্ধ করতে শ্রীকৃষ্ণ যে অমর উপদেশ দেন, তাই হলো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। এখানে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বিশ্বরূপ প্রদর্শন করেন।
·
ভীষ্মের সেনাপতিত্ব: কৌরব পক্ষের প্রধান সেনাপতি হিসেবে পিতামহ ভীষ্মের নেতৃত্বে প্রথম ১০ দিনের যুদ্ধ।
·
ভীষ্মের পরাক্রম: বৃদ্ধ ভীষ্মের অজেয় বীরত্বের সামনে পাণ্ডব বাহিনীর নাজেহাল অবস্থা। শ্রীকৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে ভীষ্মকে বধ করার জন্য প্রতিজ্ঞা ভেঙে সুদর্শন চক্র (বা রথের চাকা) হাতে তুলে নিতে উদ্যত হন।
·
শিখণ্ডীর প্রবেশ: ভীষ্মকে পরাজিত করা অসম্ভব জেনে পাণ্ডবরা শিখণ্ডীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, কারণ ভীষ্ম শিখণ্ডীর বিরুদ্ধে অস্ত্র না তোলার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।
·
ভীষ্মের পতন ও শরশয্যা: শিখণ্ডীর আড়ালে থেকে অর্জুন ভীষ্মকে অসংখ্য তীরে বিদ্ধ করেন। ভীষ্ম রণক্ষেত্রে শরশয্যায় (তীরের বিছানায়) শায়িত হন।
·
ইচ্ছামৃত্যুর বর: যেহেতু ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর বর ছিল এবং তখন দক্ষিণায়ন চলছিল, তাই তিনি দেহত্যাগ না করে উত্তরায়ণের অপেক্ষা করতে থাকেন।
একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
|
বিষয় |
বিবরণ |
|
মোট দিন |
১০ দিনের যুদ্ধের বর্ণনা |
|
প্রধান চরিত্র |
শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন, ভীষ্ম, শিখণ্ডী, সঞ্জয় |
|
বিখ্যাত অংশ |
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (অধ্যায় ২৫ থেকে ৪২) |
|
সমাপ্তি |
পিতামহ ভীষ্মের শরশয্যা গ্রহণের মাধ্যমে এই পর্ব শেষ হয় |
ভীষ্মের পতনের পর মহাভারতের যুদ্ধ এক নতুন এবং আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আপনার কৌতূহল মেটাতে দ্রোণপর্বের সেই রোমাঞ্চকর ঘটনাবলি নিচে তুলে ধরছি:
১. দ্রোণাচার্যের সেনাপতিত্ব
ভীষ্মের শরশয্যার পর কৌরব শিবিরের সেনাপতি হন পাণ্ডব ও কৌরবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য। ভীষ্ম যুদ্ধের কিছু নৈতিক নিয়ম মেনে চলতেন, কিন্তু দ্রোণাচার্য ছিলেন অনেক বেশি আগ্রাসী। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে হয় তিনি যুধিষ্ঠিরকে বন্দি করবেন, না হয় পাণ্ডবদের ধ্বংস করবেন।
২. যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন: কর্ণের প্রবেশ
ভীষ্ম যতদিন সেনাপতি ছিলেন, ততদিন তাঁর সঙ্গে বিবাদের কারণে কর্ণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। ভীষ্মের পতনের পর কর্ণ কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেন, যা কৌরবদের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৩. চক্রব্যূহ ও অভিমন্যু বধ
দ্রোণাচার্য পাণ্ডবদের পরাজিত করতে অত্যন্ত জটিল 'চক্রব্যূহ' রচনা করেন। অর্জুন তখন যুদ্ধের অন্য প্রান্তে ব্যস্ত ছিলেন। তরুণ বীর অভিমন্যু সেই ব্যূহে প্রবেশ করতে পারলেও বের হওয়ার পথ জানতেন না। কৌরবদের সাতজন মহারথী মিলে অন্যায়ভাবে নিরস্ত্র অভিমন্যুকে হত্যা করেন। এই ঘটনা পাণ্ডবদের মধ্যে শোকের বদলে চরম প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
৪. অর্জুনের জয়দ্রথ বধের প্রতিজ্ঞা
পুত্র অভিমন্যুর মৃত্যুর জন্য দায়ী জয়দ্রথকে পরের দিন সূর্যাস্তের আগে বধ করার কঠোর প্রতিজ্ঞা করেন অর্জুন। সেই দিন দ্রোণাচার্য জয়দ্রথকে রক্ষা করতে সমুদ্রের মতো বিশাল সৈন্যব্যূহ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের কৌশলের কাছে তা পরাজিত হয়।
৫. দ্রোণাচার্যের পতন
দ্রোণাচার্যকে অস্ত্র হাতে হারানো অসম্ভব ছিল। তাই শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে পাণ্ডবরা কৌশলের আশ্রয় নেন। 'অশ্বত্থামা' নামক একটি হাতির মৃত্যুর খবরকে তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার মৃত্যু বলে প্রচার করা হয়। পুত্রশোকাতুর দ্রোণাচার্য যখন ধ্যানে বসেন, তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁর শিরশ্ছেদ করেন।
কৌরব পক্ষের সেনাপতিদের ক্রমতালিকা
|
সেনাপতি |
যুদ্ধের সময়কাল |
প্রধান ঘটনা |
|
ভীষ্ম |
১ম - ১০ম দিন |
শরশয্যা গ্রহণ |
|
দ্রোণাচার্য |
১১শ - ১৫শ দিন |
চক্রব্যূহ নির্মাণ ও মৃত্যু |
|
কর্ণ |
১৬শ - ১৭শ দিন |
অর্জুনের হাতে মৃত্যু |
|
শল্য |
১৮শ দিন (অর্ধবেলা) |
যুধিষ্ঠিরের হাতে মৃত্যু |
দ্রোণাচার্যের পতনের পর শুরু হয় কর্ণপর্ব—যা মহাভারতের যুদ্ধের সম্ভবত সবথেকে রোমাঞ্চকর এবং আবেগঘন অংশ। কর্ণ যখন সেনাপতির দায়িত্ব নেন, তখন যুদ্ধ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
আপনার জন্য কর্ণের বীরত্ব এবং অর্জুনের সঙ্গে সেই চূড়ান্ত যুদ্ধের মূল ঘটনাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. কর্ণের অপরাজেয় সেনাপতিত্ব
দ্রোণাচার্যের মৃত্যুর পর কৌরব বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে কর্ণ অগ্রণী ভূমিকা নেন। তিনি ১৬শ এবং ১৭শ দিনে অবিশ্বাস্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। পাণ্ডব পক্ষের প্রধান বীরদের (ভীম, যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব) তিনি পরাজিত করলেও কুন্তীকে দেওয়া তাঁর কথা রাখতে গিয়ে তাঁদের প্রাণদান করেন।
২. শল্য ও কর্ণের সারথি বিতর্ক
কর্ণের সারথি হন মদ্ররাজ শল্য। কিন্তু শল্য মনে মনে পাণ্ডবদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি কর্ণের মনোবল ভাঙার জন্য প্রতিনিয়ত অর্জুনের প্রশংসা এবং কর্ণের সমালোচনা করতে থাকেন। এই মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যেও কর্ণ অটল ছিলেন।
৩. ভীম-দুঃশাসন যুদ্ধ
কর্ণপর্বের একটি বড় ঘটনা হলো ভীম কর্তৃক দুঃশাসন বধ। দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিশোধ নিতে ভীম অত্যন্ত ভয়ঙ্করভাবে দুঃশাসনকে হত্যা করেন, যা দেখে কৌরব শিবিরে ত্রাসের সৃষ্টি হয়।
৪. অর্জুন ও কর্ণের চূড়ান্ত দ্বৈরথ (১৭শ দিন)
এই যুদ্ধ ছিল তৎকালীন পৃথিবীর দুই শ্রেষ্ঠ ধনুর্বীরের লড়াই। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ছিল নিম্নরূপ:
- অস্ত্রের লড়াই: দুই বীরই একে অপরের ওপর দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করেন। কর্ণের 'নাগাশ্র' থেকে অর্জুনকে রক্ষা করতে শ্রীকৃষ্ণ রথকে খানিকটা মাটিতে বসিয়ে দেন।
- অভিশাপের প্রভাব: মহর্ষি পরশুরামের অভিশাপে যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে কর্ণ তাঁর ব্রহ্মাস্ত্রের মন্ত্র ভুলে যান।
- রথের চাকা বসে যাওয়া: পূর্বজন্মের ও এক ব্রাহ্মণের অভিশাপে কর্ণের রথের চাকা কাদা বা মাটিতে বসে যায়।
৫. কর্ণের পতন
রথের চাকা তোলার জন্য কর্ণ যখন নিচে নামেন এবং অর্জুনকে যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী অপেক্ষা করতে বলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মনে করিয়ে দেন যে অভিমন্যু বধ বা দ্রৌপদীর অপমানের সময় কৌরবরা কোনো নিয়ম মানেনি। শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন তাঁর 'অঞ্জলিকা' অস্ত্র দিয়ে রথহীন, নিরস্ত্র কর্ণের শিরশ্ছেদ করেন।
কর্ণের বীরত্বের বিশেষ দিক
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
দানবীর |
যুদ্ধের আগেই ইন্দ্রকে নিজের কবচ ও কুণ্ডল দান করে তিনি শক্তিহীন হয়েছিলেন। |
|
একনিষ্ঠতা |
তিনি জানতেন পাণ্ডবরা তাঁর ভাই, তবুও বন্ধু দুর্যোধনের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করেননি। |
|
পরাজয় |
তাঁর পরাজয় বীরত্বের অভাবে নয়, বরং ভাগ্য এবং অভিশাপের কারণে হয়েছিল। |
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সেই ১৮তম দিন বা শল্যপর্বের কাহিনী অত্যন্ত নাটকীয় এবং শিক্ষণীয়। কর্ণের পতনের পর কৌরব শিবির প্রায় শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তবুও যুদ্ধের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. শল্যরাজার সেনাপতিত্ব
কর্ণের মৃত্যুর পর দুর্যোধন তাঁর মাতুল মদ্ররাজ শল্যকে কৌরব বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন। শল্য ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী বীর, কিন্তু সেইদিন মধ্যাহ্নের মধ্যেই যুধিষ্ঠিরের হাতে তিনি নিহত হন। শল্যের পতনের সাথে সাথে কৌরব সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
২. শকুনির মৃত্যু
পাণ্ডবদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা সহদেব এই ১৮তম দিনেই কুরু বংশের ধ্বংসের মূল কারিগর শকুনিকে সপুত্রক হত্যা করেন। এর ফলে কৌরব পক্ষের প্রায় সমস্ত প্রধান সহায়ক শেষ হয়ে যায়।
৩. দ্বৈপায়ন হ্রদে দুর্যোধন
নিজের সমস্ত ভাই এবং মিত্রদের মৃত্যু দেখে শোকে ও ভয়ে দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদের নিচে জলস্তম্ভন বিদ্যা প্রয়োগ করে লুকিয়ে থাকেন। কিন্তু পাণ্ডবরা সেখানে পৌঁছে তাঁকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানান। যুধিষ্ঠির তাঁকে শর্ত দেন যে, দুর্যোধন যেকোনো এক পাণ্ডবকে দ্বৈরথ যুদ্ধে হারাতে পারলে রাজ্য ফেরত পাবেন।
৪. ভীম ও দুর্যোধনের গদাযুদ্ধ
দুর্যোধন গদাযুদ্ধের জন্য ভীমকে বেছে নেন। বলরামের শিষ্য এই দুই বীরের যুদ্ধ দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে। দুর্যোধনের শরীর ছিল বজ্রের মতো কঠিন, তাই ভীম তাঁকে সহজে পরাস্ত করতে পারছিলেন না।
- শ্রীকৃষ্ণের সংকেত: যুদ্ধ চলাকালীন শ্রীকৃষ্ণ ভীমকে মনে করিয়ে দেন যে, দ্রৌপদীর অপমানের সময় ভীম দুর্যোধনের ঊরু (উরু) ভেঙে ফেলার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।
- পতন: গদাযুদ্ধের নিয়ম ভেঙে (নাভির নিচে আঘাত করা নিষিদ্ধ ছিল) ভীম দুর্যোধনের ঊরুতে প্রচণ্ড আঘাত করেন। দুর্যোধন রক্তাক্ত অবস্থায় রণক্ষেত্রে লুটিয়ে পড়েন।
৫. কুরুক্ষেত্রের সমাপ্তি ও অশ্বত্থামার শেষ আক্রমণ
দুর্যোধনের পতনের মাধ্যমে যুদ্ধের একপ্রকার সমাপ্তি ঘটলেও, সেই রাতেই অশ্বত্থামা ক্ষিপ্ত হয়ে পাণ্ডব শিবিরে অতর্কিতে আক্রমণ চালান এবং পাণ্ডবদের পাঁচ পুত্রকে (পঞ্চপাণ্ডব ভেবে) হত্যা করেন। পরে পাণ্ডবরা অশ্বত্থামাকে পরাজিত করে তাঁর মস্তক মণি কেড়ে নেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ফলাফল একনজরে
|
বিষয় |
বিবরণ |
|
বিজয়ী |
ধর্ম ও সত্যের পথে থাকা পাণ্ডবগণ। |
|
একমাত্র জীবিত কৌরব |
যুযুৎসু (যিনি পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন)। |
|
রাজ্যাভিষেক |
যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। |
|
শান্তিপর্ব |
যুদ্ধের পর শোকাতুর যুধিষ্ঠিরকে পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় বসে রাজনীতি ও ধর্মের উপদেশ দেন। |
@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

0 Comments