নারীর যৌনতা ও বিদ্রোহী অবস্থান: বেগম রোকেয়া: তার সময়ে 'সুলতানার স্বপ্ন' বা 'মতিচূর'-এ তিনি ধর্ম ও পর্দার যে সমালোচনা করেছিলেন, তা তখন চরম বিতর্ক তৈরি করেছিল


নারীর যৌনতা বিদ্রোহী অবস্থান: বেগম রোকেয়া: তার সময়ে 'সুলতানার স্বপ্ন' বা 'মতিচূর'- তিনি ধর্ম পর্দার যে সমালোচনা করেছিলেন, তা তখন চরম বিতর্ক তৈরি করেছিল

 

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাহিত্য কেবল সমাজ সংস্কারের দলিল নয়, বরং তা ছিল পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর মূলে এক চরম কুঠারাঘাত বিশেষ করে 'সুলতানার স্বপ্ন' (Sultan's Dream) এবং 'মতিচূর' প্রবন্ধ সংকলনে তিনি ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং অবরোধ প্রথার যে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তা সে সময়ের রক্ষণশীল সমাজের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল

তাঁর এই বিদ্রোহী অবস্থানের প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

. লিঙ্গীয় ভূমিকার আমূল পরিবর্তন (Gender Reversal)

'সুলতানার স্বপ্ন' (১৯০৫) গ্রন্থে রোকেয়া 'লেডিল্যান্ড' নামক এক কাল্পনিক রাজ্যের চিত্র এঁকেছেন, যেখানে নারীরা দেশ শাসন করে আর পুরুষরা ঘরের ভেতরে 'মর্দানা' (পর্দা) পালন করে

বিদ্রোহী অবস্থান: তিনি দেখিয়েছেন যে, বুদ্ধিবৃত্তি বা বিজ্ঞানে নারীরা পিছিয়ে নেই সোলার পাওয়ার বা জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের মতো বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ব্যবহার করে নারীরা সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে এটি ছিল তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার বিরুদ্ধে এক তাত্ত্বিক বিদ্রোহ

. ধর্মের অপব্যাখ্যা পর্দার ব্যবচ্ছেদ

'মতিচূর' প্রবন্ধমালায় (বিশেষ করে 'স্ত্রীজাতির অবনতি' প্রবন্ধে) তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে ধর্ম শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে নারী দমনের সমালোচনা করেছেন

কড়া সমালোচনা: তিনি লিখেছিলেন, পুরুষরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ধর্মের দোহাই দেয় তাঁর মতে, পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো মূলত পুরুষদের দ্বারা ব্যাখ্যাত হয়েছে বলেই তাতে নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়েছে

পর্দা বনাম অবরোধ: তিনি পর্দার বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু 'অবরোধ' বা নারীদের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করে রাখার চরম বিরোধী ছিলেন তিনি একে "জ্যান্ত কবর" এর সাথে তুলনা করেছিলেন

. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর শরীর

রোকেয়া অনুধাবন করেছিলেন যে, নারী যতক্ষণ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হবে, ততক্ষণ সে তার শরীরের ওপর নিজের অধিকার ফিরে পাবে না

যৌনতার রাজনীতি: তৎকালীন সময়ে নারীর যৌনতা ছিল কেবলই পুরুষের ভোগের বস্তু বা সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম রোকেয়া তাঁর লেখায় নারীকে একটি স্বতন্ত্র 'মানুষ' হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যার নিজস্ব আবেগ, ইচ্ছা এবং শিক্ষা লাভের অধিকার আছে

তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, "আমরা অলঙ্কার হিসেবে দাসত্বের শৃঙ্খল পরি" এটি ছিল নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য অলঙ্কারের আড়ালে বন্দিত্বের এক কড়া প্রতিবাদ

. সমকালীন বিতর্ক প্রতিক্রিয়া

রোকেয়ার এই অবস্থান তখন মুসলিম হিন্দুউভয় সমাজেই তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল

তাঁকে 'ধর্মবিদ্বেষী' বা 'পাশ্চাত্য ঘরানার' বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল

আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি পিছিয়ে আসেননি বরং বিতর্কিত বিষয়গুলোকে হাস্যরস এবং তীক্ষ্ণ যুক্তির (Sarcasm) মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, পাঠকরা ভাবতে বাধ্য হতো


বেগম রোকেয়া তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে যে "নারীবাদ" (Feminism) চর্চা করেছিলেন, তা আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক তিনি কেবল অধিকার চাননি, চেয়েছিলেন নারীর মগজের মুক্তি রোকেয়ার দূরদর্শিতা এখানেই যে, তিনি কেবল নারীর ভৌত মুক্তি (ঘরের বাইরে আসা) চাননি, বরং মানসিক বৌদ্ধিক মুক্তি বা 'মগজের মুক্তি' ওপর জোর দিয়েছিলেন

তাঁর দর্শনের এই প্রাসঙ্গিকতাকে কয়েকটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়:

. 'মানসিক দাসত্ব' বনাম স্বকীয়তা

রোকেয়া বুঝেছিলেন যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবদমিত থাকার ফলে নারীরা নিজেদের পরাধীনতাকেই 'নিয়তি' বা 'স্বভাব' বলে মেনে নিয়েছে আজ একশ বছর পরেও অনেক নারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকেন রোকেয়া যখন বলেছিলেন, "আমরা অলঙ্কার হিসেবে দাসত্বের শৃঙ্খল পরি", তখন তিনি আসলে সেই মানসিকতার দিকেই আঙুল তুলেছিলেন যেখানে নারী নিজেই নিজের অবদমনকে উদযাপন করে

. বুদ্ধিবৃত্তিক সমতা (Intellectual Equality)

রোকেয়া তাঁর 'সুলতানার স্বপ্ন'- বিজ্ঞানের জয়গান গেয়েছেন আজকের যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নারীদের STEM (Science, Technology, Engineering, Math) ফিল্ডে আসার কথা বলি, রোকেয়া তা ১৯০৫ সালেই কল্পনা করেছিলেন তাঁর মতে, মগজের মুক্তি ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় তিনি বিশ্বাস করতেন, পুরুষের মগজ আর নারীর মগজের মধ্যে জৈবিক কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্য কেবল সুযোগ চর্চায়

. ধর্মের যৌক্তিক ব্যাখ্যা সংস্কার

আজকের পৃথিবীতেও ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয় রোকেয়া কোনো ধর্মবিদ্বেষী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ধর্মের সেই 'ভণ্ড রক্ষক'দের বিরোধী যারা নিজেদের স্বার্থে শাস্ত্রের অর্থ পরিবর্তন করত তাঁর সেই সাহসী অবস্থান আজও প্রাসঙ্গিক, যেখানে তিনি শিখিয়েছেন অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং যুক্তি দিয়ে সত্যকে গ্রহণ করতে

. অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা: মুক্তির চাবিকাঠি

রোকেয়া বারবার বলেছেন, নিজের উপার্জন নিজে করতে না পারলে কোনোদিন মুক্তি আসবে না আজকের যুগে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়লেও পারিবারিক বা সামাজিক চাপে অনেককে সেই উপার্জনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে হয় রোকেয়ার সেই ডাক— "নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াও"—আজকের 'ফাইন্যান্সিয়াল ইনডিপেনডেন্স' বা অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল মন্ত্র


বেগম রোকেয়ার রচনার মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তোলে তাঁর 'মতিচূর' (প্রথম খণ্ড) এর 'স্ত্রীজাতির অবনতি' প্রবন্ধটি এই প্রবন্ধের একটি বিশেষ উক্তি বা অংশ রয়েছে যা আজও যে কোনো সমাজচিন্তকের জন্য এক বিশাল ধাক্কা

তিনি লিখেছিলেন:

"আমরা অলঙ্কাররূপে দাসত্বের শৃঙ্খলই পরিয়াছি... কুকুর যেমন তাহার প্রভুর চরণে লেজ নাড়িয়া তৃপ্ত থাকে, আমরাও সেইরূপ স্বামীর একটু সোহাগে বা মিষ্ট বাক্যে তুষ্ট হইয়া মনে করি যে, আমরা কত সুখী!"

এই উক্তিটি কেন আমাকে বিশেষভাবে ভাবায়, তার কয়েকটি কারণ নিচে তুলে ধরছি:

. শৃঙ্খলকে 'অলঙ্কার' ভাবার মনস্তত্ত্ব

রোকেয়া এখানে কেবল গয়নার কথা বলেননি, বরং নারীর মানসিক পরাধীনতাকে বুঝিয়েছেন আজও অনেক নারী সামাজিকভাবে অবদমিত থেকেও মনে করেন যে এটাই তাঁদের 'সৌভাগ্য' বা 'মর্যাদা' রোকেয়া এই বিভ্রমকে ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন তিনি বলতে চেয়েছিলেন, যে শিকল সোনার তৈরি হলেও তা শেষ পর্যন্ত শিকলই

. আত্মমর্যাদার চরম অভাব

তিনি কুকুরের উপমা ব্যবহার করে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে সমাজকে আঘাত করেছিলেন তাঁর লক্ষ্য ছিল নারীর মধ্যে সেই 'আত্মমর্যাদাবোধ' জাগিয়ে তোলা, যা ছাড়া কোনো মানুষই প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারে না সোহাগ বা দয়া নয়, বরং নারীর অধিকারকে 'দাবি' হিসেবে দেখার সাহস তিনি সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন

. গৃহকে 'কারাগার' বলা

রোকেয়া তাঁর লেখায় বারবার পর্দা বা অবরোধকে 'জ্যান্ত কবর' বলেছেন তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেনকেন কেবল নারীর জন্যই ঘরের চার দেয়াল নির্দিষ্ট? আজ যখন আমরা নারীদের কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকারের কথা বলি, তখন রোকেয়ার সেই সময়কার প্রশ্নগুলোই আমাদের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে

. বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগ (সুলতানার স্বপ্ন)

প্রবন্ধের বাইরে তাঁর 'সুলতানার স্বপ্ন'- যে সোলার পাওয়ার বা জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের কল্পনা তিনি করেছিলেন, তা আমাকে অবাক করে ১৯০৫ সালে বসে একজন নারী ভাবছেন যে মেঘ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে যুদ্ধ জয় করা সম্ভবএটিই তো সেই 'মগজের মুক্তি' সবচেয়ে বড় প্রমাণ


রোকেয়ার সমসাময়িক এই দুই মহীয়সী নারীর অবদান জানলে সে সময়ের নারী জাগরণের পূর্ণাঙ্গ ছবিটি পরিষ্কার হয় রোকেয়া যেমন তাঁর লেখনী দিয়ে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, স্বর্ণকুমারী দেবী এবং নওয়াব ফয়জুন্নেসাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজ সংস্কারে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন

তাঁদের সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:


. স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫১৯৩২)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি কেবল ঠাকুরবাড়ির কন্যা ছিলেন না, বরং নিজের যোগ্যতায় সমাজ সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছিলেন

প্রথম সফল নারী ঔপন্যাসিক: তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নারী ঔপন্যাসিক বলা হয় তাঁর 'দীপনির্বাণ' উপন্যাসটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল

ভারতী সম্পাদনা: তিনি দীর্ঘকাল 'ভারতী' পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, যা সে সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল

সখী সমিতি: ১৮৮৬ সালে তিনি 'সখী সমিতি' প্রতিষ্ঠা করেন এর মূল লক্ষ্য ছিল অসহায় বিধবা নারীদের আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁদের স্বাবলম্বী করে তোলা এটি ছিল রোকেয়ার 'আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম'-এর মতোই একটি শক্তিশালী সামাজিক উদ্যোগ

. নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪১৯০৩)

রোকেয়ার ঠিক আগের প্রজন্মের হলেও তাঁর কর্মধারা রোকেয়াকে অনুপ্রাণিত করেছিল তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম একমাত্র নারী, যাকে ব্রিটিশরা 'নওয়াব' উপাধি দিয়েছিল

নারী শিক্ষার পথিকৃৎ: কুমিল্লার লাকসামে তিনি ১৮৭৩ সালে 'ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা করেন মনে রাখতে হবে, এটি রোকেয়ার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলেরও অনেক আগের ঘটনা

সাহিত্যিক পরিচয়: তাঁর লেখা 'রূপজালাল' (১৮৭৬) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন এটি একাধারে গদ্য পদ্যের মিশ্রণে রচিত একটি আত্মজৈবনিক রোমান্টিক মহাকাব্য

সমাজসেবা: তিনি কেবল স্কুল নয়, নারীদের জন্য হাসপাতাল এবং চিকিৎসাকেন্দ্রও স্থাপন করেছিলেন তাঁর দূরদর্শিতা রোকেয়ার সমপর্যায়ের ছিল


কেন এঁরা একে অপরের পরিপূরক?

স্বর্ণকুমারী দেবী কাজ করেছিলেন প্রধানত উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের অন্তঃপুরবাসিনীদের নিয়ে

নওয়াব ফয়জুন্নেসা এবং বেগম রোকেয়া কাজ করেছিলেন মূলত মুসলিম নারীদের অবরোধ প্রথা ভেঙে শিক্ষার আলোয় আনতে

এই তিনজনের উদ্দেশ্য ছিল একনারীর মগজের মুক্তি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা

উপসংহার:

রোকেয়া কেবল একটি যুগের বা সময়ের প্রতিনিধি নন; তিনি একটি চিরন্তন চিন্তার নাম তিনি জানতেন, শরীর মুক্ত হলেও মন যদি পরাধীন থাকে, তবে সেই স্বাধীনতা অর্থহীন আজকের ডিজিটাল যুগেও যখন নারীরা সাইবার বুলিং বা অদৃশ্য সামাজিক শেকলের মুখোমুখি হন, তখন রোকেয়ার সেই **'মগজের মুক্তি'** দর্শনই তাঁদের পথ দেখায়

 


 

Post a Comment

0 Comments