জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ তাঁর মহাকাব্য 'রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু'-এর জন্য জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছিলেন। তবে সালটি নিয়ে সামান্য বিভ্রান্তি হতে পারে:
পুরস্কারটি ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯৭০ সালের জন্য।
তিনি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন ১৯৭১ সালে।
ফিরাক গোরখপুরী (১৯৬৯) এবং বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ (১৯৭০) পর পর দুই বছর এই সম্মান পান।
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে কিছু তথ্য:
উপাধি: তাঁকে তেলুগু সাহিত্যের 'কবি সম্রাট' বলা হয়।
রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু: এটি কোনো সাধারণ অনুবাদ নয়। বাল্মীকি রামায়ণের মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তিনি এতে নিজস্ব দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, তেলুগু সংস্কৃতি এবং গভীর আধ্যাত্মিকতা যোগ করেছিলেন।
বিচিত্র প্রতিভা: তিনি কেবল মহাকাব্য নয়, উপন্যাস (যেমন: বিখ্যাত 'ভেই পাদাগালু'), নাটক এবং সমালোচনাও লিখেছেন। তাঁর লেখায় একাধারে প্রাচীন ঐতিহ্য এবং আধুনিক শৈলীর সংমিশ্রণ দেখা যায়।
ফিরাক ও সত্যনারায়ণের একটি চমৎকার মিল:
মজার বিষয় হলো, ফিরাক গোরখপুরী এবং বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ দুজনেই কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন, অথচ তাঁরা অমর হয়ে আছেন নিজ নিজ মাতৃভাষা ও ঐতিহ্যের (উর্দু ও তেলুগু) সেবা করার জন্য।
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণের 'রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু' (Ramayana Kalpavrukshamu) তেলুগু সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অনন্য ও কালজয়ী মহাকাব্য। ১৯৭০ সালে এই অসাধারণ সৃষ্টির জন্যই তিনি সাহিত্যে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।
এই মহাকাব্যটি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে দেওয়া হলো:
১. মূল প্রেক্ষাপট
এটি বাল্মীকি রামায়ণের একটি আধুনিক তেলুগু রূপান্তর। তবে এটি কেবল আক্ষরিক অনুবাদ নয়; বরং কবি এতে নিজস্ব দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভক্তি রস এবং তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
২. কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
ছন্দ ও শৈলী: বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ প্রাচীন তেলুগু কাব্যশৈলী (Prabandha style) এবং সংস্কৃত অলংকারের সংমিশ্রণে এটি রচনা করেছেন। তাঁর শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত গম্ভীর এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ।
চরিত্রায়ন: তিনি রামায়ণের চরিত্রগুলোকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিশেষ করে রামের মানবিক গুণাবলী এবং রাবণের পাণ্ডিত্য ও অহংকারের দ্বন্দ্বকে তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কল্পবৃক্ষ: কাব্যটির নাম 'কল্পবৃক্ষ' দেওয়ার সার্থকতা হলো—যেমন কল্পবৃক্ষ সব মনের ইচ্ছা পূরণ করে, তেমনি এই রামায়ণ পাঠ করলে পাঠক আধ্যাত্মিক শান্তি এবং জ্ঞানের সন্ধান পান।
৩. আধ্যাত্মিক গভীরতা
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ ছিলেন একজন গভীর আস্তিক এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের একনিষ্ঠ অনুসারী। তাঁর এই কাব্যে 'অদ্বৈত বেদান্ত' এবং হিন্দু ধর্মের মূল দর্শনগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে মিশে আছে।
৪. প্রভাব ও সমালোচনা
তেলুগু সাহিত্যে তাঁকে 'কবি সম্রাট' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর ভাষা ও শৈলী কিছুটা কঠিন হওয়ায় সাধারণ পাঠকের চেয়ে পণ্ডিত মহলে এটি বেশি সমাদৃত। আধুনিক তেলুগু সাহিত্যে মহাকাব্য রচনার ধারাকে তিনি একাই পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণের 'ভেই পাদাগালু' (Veyi Padagalu) কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি তেলুগু সাহিত্যের এক কালজয়ী মহাকাব্যিক গদ্য।
এই বইটি সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য নিচে দেওয়া হলো, যা আপনাকে এর গভীরতা বুঝতে সাহায্য করবে:
১. 'ভেই পাদাগালু' (সহস্র ফণা)
এই উপন্যাসের নামের আক্ষরিক অর্থ হলো "এক হাজার ফণা"। এখানে 'ফণা' বলতে মূলত ধর্মের বা ঐতিহ্যের বিভিন্ন রূপকে বোঝানো হয়েছে।
মূল উপজীব্য: এটি ব্রিটিশ শাসন আমলের পটভূমিতে লেখা। ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতি এবং আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার যে সংঘাত, তাই এই উপন্যাসের মূল বিষয়।
রূপক: লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে হাজার ফণা বিশিষ্ট ধর্ম-সর্পটি আধুনিকতার চাপে একে একে তার ফণাগুলো হারাচ্ছে।
হিন্দি অনুবাদ: পি. ভি. নরসিমা রাও (ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) এই বিশাল উপন্যাসটি হিন্দিতে অনুবাদ করেছিলেন 'সহস্র ফণ' (Sahasrifan) নামে।
২. 'রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু'-এর বিশেষত্ব
আপনি যদি এই মহাকাব্যের কোনো বিশেষ অধ্যায় বা 'কাণ্ড' নিয়ে আলোচনা করতে চান, তবে এর 'বাল কাণ্ড' এবং 'সুন্দরা কাণ্ড' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাল কাণ্ড: এখানে কবি রামের জন্ম এবং বাল্যকালকে কেবল একটি ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আধ্যাত্মিক চেতনার জাগরণ হিসেবে দেখিয়েছেন।
শৈলী: তাঁর বর্ণনা এতই শক্তিশালী যে, পড়ার সময় মনে হয় পাঠক নিজেই সেই ত্রেতা যুগে অবস্থান করছেন।
৩. বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণের অনন্য কিছু কাজ
তিনি প্রায় সব ধরণের সাহিত্য শাখায় কাজ করেছেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে:
শ্রীমদ রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু: (যেটির কথা আমরা আলোচনা করছি)।
একবীরা (Ekaveera): এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ঐতিহাসিক এবং প্রেমের উপন্যাস, যা নিয়ে পরবর্তীতে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
পুরাণ বৈর গ্রন্থমালা: ভারতীয় ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচাতে তিনি একগুচ্ছ ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছিলেন।
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। তিনি মনে করতেন, সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার একটি মাধ্যম।তেলুগু সাহিত্যের 'কবি সম্রাট' হিসেবে পরিচিত বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ (১৮৯৫–১৯৭৬) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ভারতীয় সাহিত্যিক। তিনি এমন এক বিরল প্রতিভা ছিলেন যিনি একাধারে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং সমালোচনা—সবক্ষেত্রেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন।
তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কাব্যিক দর্শন ও ঐতিহ্য
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ ছিলেন ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। আধুনিকতার যুগে যখন পশ্চিমী প্রভাব প্রবল হচ্ছিল, তখন তিনি তেলুগু সাহিত্যে ধ্রুপদী ধারার পুনর্জাগরণ ঘটান। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, সাহিত্যের কাজ হলো মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক চেতনা জাগ্রত করা।
২. অমর সৃষ্টি: শ্রীমদ রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু
এটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ (Magnum Opus)। এর জন্য তিনি ১৯৭০ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান।
অনন্যতা: এটি বাল্মীকি রামায়ণের হুবহু অনুবাদ নয়, বরং একটি সৃজনশীল পুনর্নির্মাণ।
রচনাকাল: এই মহাকাব্যটি সম্পন্ন করতে তাঁর দীর্ঘ কয়েক দশক সময় লেগেছিল।
শৈলী: এতে তিনি এমন এক পাণ্ডিত্যপূর্ণ তেলুগু ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা পাঠকদের কাছে এক বিশাল জ্ঞানকোষের মতো।
৩. কালজয়ী উপন্যাস: ভেই পাদাগালু (Veyi Padagalu)
তেলুগু ভাষায় এটি একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস।
নামের অর্থ: 'এক হাজার ফণা'।
কাহিনী: এখানে একটি প্রাচীন গ্রাম এবং তার ঐতিহ্যের ধ্বংসের চিত্র আঁকা হয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসনে কীভাবে ভারতীয় জীবনধারা বদলে যাচ্ছে, তা-ই এর মূল উপজীব্য।
রাজনৈতিক সংযোগ: ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাও এই উপন্যাসটি 'সহস্র ফণ' নামে হিন্দিতে অনুবাদ করেছিলেন।
৪. তাঁর বহুমুখী প্রতিভা
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ প্রায় ১০০টিরও বেশি বই লিখেছেন। তাঁর কাজের পরিধি ছিল বিশাল:
উপন্যাস: ৩০টির বেশি (যেমন: একবীরা, চেলিয়ালি কাট্টা)।
কবিতা সংকলন: ২০টির বেশি।
নাটক: ২০টির মতো।
প্রবন্ধ: ১০টির বেশি সমালোচনা ও দার্শনিক গ্রন্থ।
৫. স্বীকৃতি ও সম্মাননা
জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৭০): প্রথম তেলুগু লেখক হিসেবে এই সম্মান লাভ করেন।
পদ্মভূষণ (১৯৭০): ভারত সরকার কর্তৃক সম্মানিত হন।
সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৬২): তাঁর 'বিশ্বনাথ মধ্যক্করলু' কাব্যের জন্য।
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণকে বলা হয় "আধুনিক যুগের ধ্রুপদী কবি"। তাঁর রচনা পড়ার জন্য তেলুগু ভাষার ওপর গভীর দখলের প্রয়োজন হয়, যা তাঁকে পণ্ডিত মহলে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় করে তুলেছে।
'ভেই পাদাগালু' (Veyi Padagalu) কেবল একটি গল্প নয়, এটি একটি ভেঙে পড়া সভ্যতার মহাকাব্যিক দলিল। ১৯৩০-এর দশকে লেখা এই উপন্যাসে বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ তৎকালীন ভারতের এক অস্থির সময়ের ছবি এঁকেছেন।
এর সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মূল চরিত্রগুলো নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সামাজিক প্রেক্ষাপট: ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা
উপন্যাসটির মূল ভিত্তি হলো ব্রিটিশ ভারতের পরিবর্তনশীল সমাজ।
সংস্কৃতির সংঘাত: লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাচীন ভারতীয় গ্রাম্য জীবনধারা, ধর্ম এবং নৈতিক মূল্যবোধগুলো আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ও জীবনযাত্রার প্রভাবে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
'সহস্র ফণা'র রূপক: উপন্যাসের শিরোনামটি (এক হাজার ফণা) আসলে ধর্ম বা সনাতন ঐতিহ্যের প্রতীক। লেখক বিশ্বাস করতেন যে ধর্ম বা সংস্কৃতি হাজার হাজার বছর ধরে সমাজকে রক্ষা করে (যেমন শেষনাগ পৃথিবীকে ধরে রাখে)। কিন্তু আধুনিকতার বিষে সেই ফণাগুলো একে একে লুপ্ত হচ্ছে।
সামাজিক ভাঙন: এতে জমিদার প্রথার অবসান, গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তন এবং মানুষের মনে আধ্যাত্মিকতার চেয়ে বস্তুবাদের প্রাধান্য পাওয়ার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
২. মূল চরিত্র: ধর্ম রাও (Dharma Rao)
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ধর্ম রাও মূলত লেখকের নিজের কণ্ঠস্বর বা আদর্শের প্রতিফলন।
চরিত্রের গভীরতা: ধর্ম রাও একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ এবং পণ্ডিত। তিনি প্রাচীন মূল্যবোধের ধারক ও বাহক।
সংগ্রাম: তিনি কেবল একজন মানুষ নন, বরং তিনি একটি ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির প্রতিনিধি। পরিবর্তিত সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরেও তিনি নিজের আদর্শে অটল থাকেন।
বিপরীত চরিত্র: তাঁর বিপরীতে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত চরিত্রগুলো দেখানো হয়েছে, যারা ঐতিহ্যের চেয়ে পশ্চিমী রীতিনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
৩. উপন্যাসের গঠন ও শৈলী
ব্যাপ্তি: এই উপন্যাসে প্রায় ২৯টি ভিন্ন ভিন্ন শাখা বা উপ-কাহিনী রয়েছে যা শেষ পর্যন্ত একটি মূল ধারায় এসে মিশেছে।
দার্শনিক দিক: এতে জ্যোতিষশাস্ত্র, সঙ্গীত, নৃত্য এবং মন্দির সংস্কৃতির ওপর প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পি. ভি. নরসিমা রাও-এর অবদান: ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাও যখন এটি 'সহস্র ফণ' (Sahasrifan) নামে হিন্দিতে অনুবাদ করেন, তখন এটি সারা ভারতে ব্যাপক পরিচিতি পায়। তিনি বলেছিলেন যে, এই উপন্যাসটি পড়ার পর তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছিল।
৪. একটি কালজয়ী বার্তা
বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ এই উপন্যাসে কোনো সস্তা সমাধান দেননি। বরং তিনি এক ধরণের বিষণ্ণতার মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, আমরা আধুনিক হতে গিয়ে নিজের শেকড়কে কীভাবে হারিয়ে ফেলছি।
ফিরাক গোরখপুরী এবং বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ—দুজনেই ছিলেন তাঁদের নিজ নিজ সাহিত্যধারার (উর্দু ও তেলুগু) মহীরুহ। যদিও একজন গজল ও রুবাইয়ের মাধ্যমে এবং অন্যজন মহাকাব্য ও উপন্যাসের মাধ্যমে কথা বলেছেন, তাঁদের মধ্যে দর্শনের এক গভীর মিল এবং শৈলীর এক আকর্ষণীয় পার্থক্য বিদ্যমান।
নিচে তাঁদের ভাবধারার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. মিল: ঐতিহ্যের শেকড় ও আধুনিকতার সংঘাত
শেকড়ের প্রতি টান: দুজনেই ছিলেন প্রচণ্ডভাবে "রুটড" (Rooted)। বিশ্বনাথ যেমন তেলুগু ও সংস্কৃত ঐতিহ্যের ধারক ছিলেন, ফিরাক তেমনি উর্দু শায়েরিতে হিন্দুস্তানি সংস্কৃতি এবং উপনিষদীয় দর্শনের মিলন ঘটিয়েছিলেন।
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব: মজার বিষয় হলো, দুজনেই ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁরা পাশ্চাত্য দর্শন খুব ভালো বুঝতেন, কিন্তু নিজেদের সৃজনশীল কাজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন নিজেদের মাটিকে।
সভ্যতার সংকট: বিশ্বনাথের 'ভেই পাদাগালু'-তে যেমন আধুনিকতার চাপে ঐতিহ্যের বিনাশ দেখানো হয়েছে, ফিরাকের কবিতাতেও আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা এবং যান্ত্রিকতার বিপরীতে প্রেমের এক শাশ্বত রূপ খোঁজার চেষ্টা ছিল।
২. পার্থক্য: প্রকাশের ধরন ও মেজাজ
৩. একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ
বিশ্বনাথ যেখানে 'ভেই পাদাগালু'-তে ঐতিহ্যের ক্ষয় দেখে এক ধরণের তীব্র প্রতিবাদ বা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছিলেন, ফিরাক সেখানে ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেও আধুনিক যুগের প্রেমের ভাষাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। ফিরাক বলতেন—
"বহত দিনে মেঁ মহব্বত কো যিন্দিগি সমঝা..." > (অনেক দিন পর আমি প্রেমকে জীবনের সমার্থক হিসেবে বুঝলাম)।
অন্যদিকে বিশ্বনাথের কাছে জীবন ছিল মূলত 'ধর্ম' বা নৈতিক শৃঙ্খলার এক অবিরাম ধারা।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ ছিলেন একজন 'সংরক্ষণশীল দ্রষ্টা', যিনি অতীতকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। আর ফিরাক গোরখপুরী ছিলেন একজন 'সমন্বয়বাদী কবি', যিনি অতীতকে বর্তমানের সাথে মিশিয়ে এক নতুন শৈলী তৈরি করেছিলেন।
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই

- মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ

- কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড়

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি



0 Comments