জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা

  




জ্ঞানপীঠ পুরস্কার  -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা

১৯৬৯ সালে উর্দূ ভাষার বিখ্যাত কবি ফিরাক গোরখপুরীকে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘গুল-এ-নগমা’-র জন্য তিনি এই সম্মানে ভূষিত হন।

ফিরাক গোরখপুরী ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভা। তিনি যেমন উর্দু কবিতায় নতুন গতি এনেছেন, তেমনই তাঁর লেখা সমালোচনা ও নিবন্ধও সাহিত্যের পাঠকদের আকর্ষণ করেছে। ‘গুল-এ-নগমা’ তাঁর অন্যতম প্রধান কাব্যগ্রন্থ, যেখানে তিনি প্রেম, প্রকৃতি ও দর্শনের গভীর সংযোগকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই গ্রন্থে তাঁর গজল, নজম ও রুবাইয়ের সংকলন রয়েছে, যা উর্দু সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এক অমূল্য উপহার।

জ্ঞানপীঠ পুরস্কার ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার। ভারতীয় সাহিত্যের মান উন্নয়নে অবদানকারী সাহিত্যিকদের সম্মান জানাতে ১৯৬১ সালে এই পুরস্কার চালু করা হয়। জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্তি ফিরাক গোরখপুরীর প্রতিভার যথাযথ স্বীকৃতি।

গুল-এ-নগমা’ ফিরাক গোরখপুরীর একটি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ, যা ১৯৬৯ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছিল। এই বইটি উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয়। ফিরাক গোরখপুরীর লেখা কবিতাগুলিতে প্রেম, প্রকৃতি ও দর্শনের গভীর সংযোগ ফুটে উঠেছে। ‘গুল-এ-নগমা’-র মূল বিষয় হলো প্রেম, যা তিনি খুব গভীর ও সুচারুভাবে ব্যক্ত করেছেন। তাঁর প্রেমিকা কে ছিলেন, তা স্পষ্ট নয়, তবে তাঁর কবিতাগুলিতে এক পরম সত্তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায়। ফিরাক গোরখপুরীর কবিতাগুলি রূপকধর্মী, যা পাঠকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।

এই বইটি পড়তে গেলে বোঝা যায় যে, প্রেম কেবল মানুষের প্রতি নয়, বরং সমস্ত সৃষ্টির প্রতিই অনুভব করা যায়। ‘গুল-এ-নগমা’-র কবিতাগুলি আমাদের প্রেম ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে সাহায্য করে। ফিরাক গোরখপুরীর লেখা কবিতাগুলি আমাদের মনে এক অদ্ভুত ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। তাঁর কবিতাগুলি আমাদের জীবনকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করে। এই বইটি পড়তে গেলে পাঠক যেন এক অন্য জগতে চলে যান, যেখানে কেবল প্রেম ও সৌন্দর্য রয়েছে।

ফিরাক গোরখপুরী (১৮৯৬–১৯৮২) বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যের একজন কিংবদন্তি কবি এবং সমালোচক। তার আসল নাম ছিল রঘুপতি সহায়। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, বরং উর্দু গজলকে আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধনে রূপান্তর করেছিলেন।

তার সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • জন্ম: ২৮ আগস্ট, ১৮৯৬ সালে উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরে।

  • শিক্ষা: এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।

  • পেশা: তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন।

২. সাহিত্যিক অবদান

ফিরাক গোরখপুরী উর্দু গজলকে প্রথাগত "প্রেমিকা ও মদ্যশালা"র গণ্ডি থেকে বের করে এনেছিলেন। তার কবিতায় ফুটে উঠত:

  • ভারতীয় দর্শন: তিনি উর্দু কবিতায় উপনিষদ এবং হিন্দুস্তানি সংস্কৃতির নির্যাস মিশিয়ে দিয়েছিলেন।

  • প্রকৃতি ও রূপ: মানুষের দৈহিক সৌন্দর্য এবং প্রকৃতির বর্ণনা তার কলমে এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল।

  • গজল ও রুবাই: তিনি শুধু গজল নয়, তার 'রুবাই' (চতুর্পদী কবিতা)-এর জন্যও সমানভাবে সমাদৃত।

৩. উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা

ফিরাক গোরখপুরী তার কাজের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মানগুলোতে ভূষিত হয়েছেন:

  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৬৯): তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'গুল-এ-নাগমা'-এর জন্য তিনি প্রথম উর্দু কবি হিসেবে এই সম্মান পান।

  • সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার: ১৯৬০ সালে।

  • পদ্মভূষণ: ১৯৬৮ সালে।


৪. তাঁর একটি বিখ্যাত শের

তার রচনার গভীরতা বুঝতে এই পঙক্তিটি বেশ জনপ্রিয়:

"সর-জ়মিন-এ-হিন্দ পর অক্কোয়াম-এ-আলম কে ফিরাক, কাফিলে বস্তে গয়ে, হিন্দুস্তাঁ বনতা গয়া।"

ফিরাক গোরখপুরীর কাব্যপ্রতিভা বুঝতে হলে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি 'গুল-এ-নাগমা' এবং তাঁর গজলের বিশেষ শৈলী নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।

ফিরাক ছিলেন এমন একজন কবি, যিনি উর্দু শায়েরিতে এক ধরণের "মায়াবী বিষণ্ণতা" এবং "ভারতীয় নারীত্বের" রূপ ফুটিয়ে তুলেছিলেন। নিচে তাঁর বিশেষ কিছু কাজ ও বৈশিষ্ট্য দেওয়া হলো:

১. শ্রেষ্ঠ সংকলন: গুল-এ-নাগমা (Gul-e-Naghma)

এটি তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। এই বইটির জন্যই তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই সংকলনের বৈশিষ্ট্য হলো:

  • এতে গজলের পাশাপাশি প্রচুর রুবাই (চতুর্পদী কবিতা) আছে।

  • ফিরাক উর্দু কবিতায় প্রথমবার সফলভাবে ভারতীয় গৃহস্থালি জীবন এবং মা-ছেলের সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আসেন, যা আগে মূলত ফারসি ঘরানার প্রেমে সীমাবদ্ধ ছিল।

২. তাঁর গজলের বিশেষত্ব

ফিরাকের গজল পড়ার সময় মনে হয় যেন কোনো শিল্পী ধীরলয়ে ছবি আঁকছেন। তাঁর গজলে বিরহ আছে, কিন্তু তাতে হাহাকারের চেয়ে গাম্ভীর্য বেশি। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত শের (পঙ্ক্তি) যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে:

"বহত পহলে সে কদমো কি আহট জান লেতে হ্যায়, তুঝে অ্যায় জিন্দেগি হম দূর সে পহেচান লেতে হ্যায়।" (অনেক আগে থেকেই চরণের শব্দ শুনে চিনে নিতে পারি; হে জীবন, তোমাকে আমি দূর থেকেই চিনে নিতে জানি।)


৩. ফিরাকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজ

গজলের বাইরেও তিনি গদ্য ও সমালোচনায় দক্ষ ছিলেন:

  • রূপ (Roop): এটি তাঁর রুবাই বা চতুর্পদী কবিতার একটি বিখ্যাত সংকলন। এখানে তিনি ভারতীয় সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন।

  • উর্দু কি ইশকিয়া শায়রি: উর্দু প্রেমমূলক কবিতার ওপর তাঁর গভীর বিশ্লেষণধর্মী কাজ।


পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে  অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com





  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী  
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই 
  • মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ 
  • কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার  -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড় 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি 

ফিরাক সম্পর্কে একটি মজার তথ্য

তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। বলা হয়, তিনি ক্লাসে ইংরেজি পড়ানোর সময়ও মাঝেমধ্যে উর্দু শায়েরির গভীর দর্শন মিশিয়ে দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভালো কবিতা হতে হলে তাতে "কায়নাত" বা মহাবিশ্বের স্পন্দন থাকতে হবে।

Post a Comment

0 Comments