শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-26-50 ( শ্লোক) শব্দার্থ (Word Meaning)
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের ২৬ নম্বর শ্লোকে দেখা যায়, কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রে দুই পক্ষের সৈন্যদলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্জুন যখন দৃষ্টিপাত করলেন, তখন তিনি এক অত্যন্ত আবেগঘন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন।
শ্লোকটি হলো:
তত্রাপশয়ৎ স্থিতান পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান।
আচার্যান মাতুলান ভ্রাতৃন পুত্ৰান পৌত্রান সখীন তথা।।
শ্বশুরান সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুভয়োরপি।।
শ্লোকের প্রেক্ষাপট ও অর্থ:
এই শ্লোকে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে জানাচ্ছেন যে, অর্জুন উভয় পক্ষের সৈন্যদলের মধ্যে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের দেখতে পেলেন:
পিতৃব্য ও পিতামহ: তাঁর কাকা, জ্যাঠা এবং পিতামহ ভীষ্ম।
আচার্যগণ: তাঁর গুরু দ্রোণাচার্য ও কৃপাচার্য।
মাতুল ও ভ্রাতৃগণ: মামারা (যেমন শল্য) এবং নিজের ভাই ও খুড়তুতো-জেঠতুতো ভাইয়েরা (কৌরবগণ)।
পুত্র ও পৌত্রগণ: নিজেদের এবং আত্মীয়দের ছেলে ও নাতিরা।
বন্ধু ও শ্বশুরকুল: প্রিয় বন্ধুগণ এবং শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা (যেমন দ্রুপদ)।
মূল তাৎপর্য:
অর্জুন যখন যুদ্ধ করতে এসেছিলেন, তখন তাঁর মনে ছিল বীরত্ব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সংকল্প। কিন্তু এই ২৬ নম্বর শ্লোকে দেখা যায়, তিনি যখন দেখলেন যে যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁকে অস্ত্র ধরতে হবে, তাঁরা অন্য কেউ নন—বরং তাঁর অত্যন্ত আপনজন, রক্ত সম্পর্কের আত্মীয় এবং পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজন।
এই দৃশ্য দেখার পরেই অর্জুনের মনে গভীর বিষাদ ও মোহের সৃষ্টি হয়, যা তাঁকে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত থেকে বিচলিত করে তোলে। এখান থেকেই অর্জুনের সেই বিখ্যাত মানসিক দ্বন্দ্বের শুরু, যার প্রেক্ষিতে শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে গীতার অমৃতবাণী প্রদান করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বিভিন্ন অধ্যায়ের ২৭ নম্বর শ্লোকগুলো বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আপনি যদি প্রথম অধ্যায়ের (অর্জুনবিষাদ যোগ) ২৭ নম্বর শ্লোকের কথা বুঝিয়ে থাকেন, তবে সেখানে যুদ্ধের ময়দানে অর্জুনের মানসিক অবস্থার একটি সন্ধিক্ষণ দেখা যায়।
প্রথম অধ্যায়, শ্লোক ২৭:
তান্ সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধূনবস্থিতান্।
পরয়া কৃপয়াবিষ্টো বিষীদিন্নিদমব্রবীত্।।
সরলার্থ: কুন্তীপুত্র অর্জুন যখন সেই সমস্ত আত্মীয়-স্বজনকে যুদ্ধের জন্য উপস্থিত দেখলেন, তখন তিনি অত্যন্ত করুণাবিষ্ট ও শোকাতুর হয়ে বিষাদগ্রস্ত মনে এই কথাগুলি বললেন।
এই শ্লোকের মূল বিষয়বস্তু:
আত্মীয়তার মোহ: অর্জুন যখন দেখলেন যে বিপক্ষ দলে তাঁরই পিতামহ (ভীষ্ম), আচার্য (দ্রোণ), মামা, ভাই এবং বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছেন, তখন তাঁর বীরত্বের পরিবর্তে 'মোহ' ও 'মমত্ববোধ' জাগ্রত হলো।
মানসিক পরিবর্তন: যুদ্ধের উন্মাদনা নিমেষেই গভীর বিষাদে পরিণত হলো। এখান থেকেই অর্জুনের সেই বিখ্যাত মানসিক দ্বন্দ্বের শুরু, যা শেষ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের মুখনিসৃত গীতার বাণীর মাধ্যমে নিরসন হয়।
করুণার উদয়: শ্লোকটিতে 'পরয়া কৃপয়া' (পরম করুণা) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে অর্জুন তখন একজন যোদ্ধার মানসিকতা হারিয়ে একজন সাধারণ আবেগপ্রবণ মানুষের মতো চিন্তা করছিলেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে (মোক্ষসংন্যাস যোগ) ২৮ নম্বর শ্লোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ 'তামস কর্তা' বা অশুভ কর্মে লিপ্ত ব্যক্তির লক্ষণসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন।
শ্লোকটি হলো:
অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈষ্কৃতিকোঽলসঃ।
বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।। ২৮।।
শ্লোকের মূল বিষয়বস্তু: তামস কর্তার লক্ষণ
এই শ্লোকে একজন তামস কর্তার আটটি প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে:
১. অযুক্ত (Unsteady): যিনি শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধ মানেন না বা চঞ্চল স্বভাবের।
২. প্রাকৃত (Materialistic): যার বিবেক নেই, অতিমাত্রায় ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন।
৩. স্তব্ধ (Stubborn/Arrogant): অত্যন্ত অবাধ্য এবং অহঙ্কারী; যিনি বড়দের বা গুরুজনদের সম্মান করেন না।
৪. শঠ (Deceitful): যার মনে এক আর মুখে অন্য; যে অপরকে ঠকাতে পটু।
৫. নৈষ্কৃতিক (Insulting/Malicious): অন্যের জীবিকা হরণকারী বা অপরের অনিষ্ট করতে উৎসুক।
৬. অলস (Lazy): কর্তব্যকর্মে বিমুখ এবং অত্যন্ত কুঁড়ে।
৭. বিষাদী (Morose): সবসময় দুঃখী বা হতাশাবাদী। ছোটখাটো বিষয়েও যিনি ভেঙে পড়েন।
৮. দীর্ঘসূত্রী (Procrastinating): যিনি আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখেন এবং কাজ শেষ করতে অযথা দেরি করেন।
সহজ ব্যাখ্যা
এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সাবধান করেছেন যে, কর্ম করলেই হয় না, কর্মটি কোন মানসিকতা নিয়ে করা হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউ অলসতা, অহংকার বা অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছা নিয়ে কাজ করে, তবে সেই ব্যক্তিকে তামস কর্তা বলা হয়। এই ধরনের স্বভাব মানুষকে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক—উভয় দিক থেকেই পতনের দিকে নিয়ে যায়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বিভিন্ন অধ্যায়ের ২৯ নম্বর শ্লোকগুলো বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আপনি যদি ভক্তিযোগ (দ্বাদশ অধ্যায়) বা সাঙ্খ্যযোগ (দ্বিতীয় অধ্যায়) নিয়ে আলোচনা না করে থাকেন, তবে সাধারণত সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় পঞ্চম অধ্যায়ের (কর্মসন্ন্যাস যোগ) ২৯ নম্বর শ্লোকটি।
এখানে ৫ম অধ্যায়ের ২৯ নম্বর শ্লোকের ব্যাখ্যা দেওয়া হলো, যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের "শান্তি মন্ত্র" হিসেবে পরিচিত:
শ্লোক (৫.২৯)
ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি।।
সহজ অর্থ
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন: "আমাকে সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার পরম ভোক্তা, সমস্ত গ্রহ ও লোকসমূহের পরমেশ্বর এবং সমস্ত জীবের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে জেনে মানুষ শান্তি লাভ করে।"
মূল বিশ্লেষণ
এই শ্লোকে পরম শান্তি লাভের তিনটি প্রধান সূত্রের কথা বলা হয়েছে:
পরম ভোক্তা: আমরা যা কিছু করি বা উৎসর্গ করি, তার চূড়ান্ত মালিক ও আস্বাদনকারী ভগবান স্বয়ং।
পরমেশ্বর: তিনি শুধু মহাবিশ্বের স্রষ্টা নন, তিনি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। এই বোধ থাকলে মানুষের মধ্যে অহংকার থাকে না।
** পরম বন্ধু:** ভগবান আমাদের সবচেয়ে কাছের নিঃস্বার্থ বন্ধু। যখন কেউ বোঝে যে ঈশ্বর তার মঙ্গলের জন্যই সবকিছু করছেন, তখন তার ভয় বা উদ্বেগ থাকে না।
অন্য কোনো অধ্যায়ের ২৯ নম্বর শ্লোক কি খুঁজছেন?
যদি আপনি অন্য কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায় সম্পর্কে জানতে চান, তবে নিচের তালিকাটি দেখতে পারেন:
২য় অধ্যায় (২৯): আত্মার বিস্ময়কর স্বরূপ নিয়ে আলোচনা (কেউ আত্মাকে আশ্চর্যভাবে দেখে, কেউ আশ্চর্যভাবে শোনে)।
৬ষ্ঠ অধ্যায় (২৯): একজন প্রকৃত যোগী কীভাবে সমস্ত জীবের মধ্যে পরমাত্মাকে দর্শন করেন।
৯ম অধ্যায় (২৯): ভগবানের সমদর্শিতা (তিনি কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন না, আবার কেউ তাঁর বিশেষ প্রিয় নয়; কিন্তু যারা ভজনা করে তারা তাঁর মধ্যেই বাস করে)।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় (সাঙ্খ্যযোগ)-এর ৩০ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আত্মার অবিনশ্বরতা সম্পর্কে তাঁর আলোচনার উপসংহার টেনেছেন।
শ্লোকটি হলো:
দেহী নিত্যমবধ্যোহয়ং দেহে সর্বস্য ভারত।
তস্মাৎ সর্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।। ৩০।।
সহজ অর্থ:
হে ভারত (অর্জুন)! প্রত্যেকের দেহে অবস্থানকারী এই আত্মা সর্বদা অবধ্য (একে হত্যা করা যায় না)। সুতরাং, কোনো প্রাণীর জন্যই তোমার শোক করা উচিত নয়।
মূল শিক্ষা ও প্রেক্ষাপট:
আত্মার অমরত্ব: শ্রীকৃষ্ণ শুরু থেকেই বোঝাচ্ছিলেন যে দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অবিনাশী। ৩০ নম্বর শ্লোকে তিনি জোর দিয়ে বলছেন যে, কেবল বিশেষ কিছু মানুষের নয়, বরং "সর্বস্য" অর্থাৎ সকল প্রাণীর দেহের ভেতরে থাকা আত্মাই নিত্য ও চিরস্থায়ী।
কর্তব্যে স্থির হওয়া: অর্জুন তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হারানোর ভয়ে বিচলিত ছিলেন। কৃষ্ণ তাঁকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, যুদ্ধের ফলে কেবল দেহের বিনাশ সম্ভব, আত্মার নয়। যেহেতু আত্মা মরে না, তাই শোক করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
অর্জুনের প্রতি সম্বোধন: এখানে অর্জুনকে 'ভারত' বলে সম্বোধন করা হয়েছে, যা তাঁর মহান বংশের পরিচয় দেয় এবং তাঁকে মোহমুক্ত হয়ে ক্ষত্রিয়োচিত ধর্ম পালনে উৎসাহিত করে।
সারকথা:
এই শ্লোকটি মূলত একটি অভয়বাণী। এটি আমাদের শেখায় যে মৃত্যু কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন, ভেতরের সত্যটি (আত্মা) সবসময় নিরাপদ।
গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৩১ নম্বর শ্লোকটি ব্যাখ্যা করছি।
যদি আপনি অন্য কোনো গ্রন্থের কথা বুঝিয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই জানাবেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (অধ্যায় ২, শ্লোক ৩১)
শ্লোক:
স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি।
ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহন্যত্ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে।।
সরল অর্থ: নিজের ধর্ম (কর্তব্য) বিবেচনা করেও তোমার দ্বিধাবোধ করা উচিত নয়। কারণ ধর্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের চেয়ে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মঙ্গলকর আর কিছুই নেই।
মূল তাৎপর্য
এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বিষাদগ্রস্ত অবস্থা থেকে বের করে আনার জন্য কিছু জোরালো যুক্তি দিয়েছেন:
স্বধর্ম পালন: এখানে 'স্বধর্ম' বলতে সামাজিক ও নৈতিক কর্তব্যকে বোঝানো হয়েছে। অর্জুন একজন যোদ্ধা (ক্ষত্রিয়), আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই তার প্রধান কাজ।
ভয় ও দ্বিধা ত্যাগ: অর্জুন যখন আত্মীয়দের হারানোর ভয়ে যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে যেতে চাইছিলেন, তখন কৃষ্ণ মনে করিয়ে দেন যে আদর্শ বিচ্যুত হওয়া বীরের লক্ষণ নয়।
ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম: কৃষ্ণের মতে, একজন যোদ্ধার কাছে ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করার সুযোগ আসা ভাগ্যের ব্যাপার। এটি কেবল একটি সংঘাত নয়, এটি সত্য প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ)-এর ৩২ নম্বর শ্লোকের কথা বুঝিয়ে থাকেন, তবে সেটি হলো:
যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্।
সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্।। ৩২।।
সরল অর্থ:
হে পার্থ! আপন ইচ্ছায় উপস্থিত হওয়া এবং স্বর্গের উন্মুক্ত দ্বার স্বরূপ এই প্রকার যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ কেবল ভাগ্যবান ক্ষত্রিয়রাই পেয়ে থাকেন।
শ্লোকটির প্রেক্ষাপট ও মূলভাব:
ধর্মযুদ্ধ: এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, এই যুদ্ধটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ধর্মের সংস্থাপনের জন্য। এমন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ক্ষত্রিয়দের জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়।
স্বর্গের দ্বার: শাস্ত্রমতে, ধর্মযুদ্ধে প্রাণত্যাগ করলে বা যুদ্ধ করলে বীর যোদ্ধাদের জন্য স্বর্গের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
কর্তব্য পালন: অর্জুন যখন বিষাদগ্রস্ত হয়ে যুদ্ধ ত্যাগ করতে চাইছিলেন, তখন ভগবান তাকে মনে করিয়ে দেন যে, সুযোগ আসা সত্ত্বেও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হওয়া বীরোচিত নয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায়ের ৩৩ নম্বর শ্লোকের কথা বলছেন। হিন্দুধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলোতে ৩৩ নম্বর শ্লোকটি প্রায়শই খুব গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
যেহেতু আপনি অধ্যায় উল্লেখ করেননি, তাই সাধারণত মানুষ যে ৩৩ নম্বর শ্লোকটি সবচেয়ে বেশি খোঁজেন, সেটি নিচে দেওয়া হলো:
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: তৃতীয় অধ্যায় (কর্মযোগ)
সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতের্জ্ঞানবানপি।
প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি।। ৩৩।।
সরলার্থ: এমনকি জ্ঞানী ব্যক্তিও তাঁর নিজের স্বভাব বা প্রকৃতি অনুসারে কাজ করেন। সমস্ত জীবই তাদের অর্জিত প্রকৃতিকে অনুসরণ করে; সুতরাং নিছক জেদ বা জোরপূর্বক দমন (নিগ্রহ) করে কী লাভ হবে?
মূল বার্তা:
স্বভাবের গুরুত্ব: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে বোঝাচ্ছেন যে, প্রতিটি মানুষের মধ্যে একটি সহজাত প্রকৃতি বা 'স্বভাব' থাকে।
জোরপূর্বক দমন নয়: নিজের প্রকৃতিকে অস্বীকার করে জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বরং নিজের স্বভাবকে চিনে নিয়ে তাকে সঠিক পথে (ধর্মের পথে) চালিত করাই হলো প্রকৃত সাধনা।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: একাদশ অধ্যায় (বিশ্বরূপ দর্শন যোগ)
যদি আপনি যুদ্ধের ময়দানে অর্জুনের প্রতি কৃষ্ণের নির্দেশের কথা ভাবেন, তবে এই ৩৩ নম্বর শ্লোকটিও অত্যন্ত জনপ্রিয়:
তস্মাত্ত্বমুত্তিষ্ঠ যশো লভস্ব জিত্বা শত্রুন্ ভুঙ্ক্ষ্ব রাজ্যং সমৃদ্ধম্।
ময়ৈবৈতে নিহতাঃ পূর্বমেব নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।। ৩৩।।
সরলার্থ: "অতএব তুমি ওঠো, যুদ্ধ করে যশ লাভ করো এবং শত্রুদের জয় করে সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ করো। এরা সবাই আমার দ্বারা আগেই নিহত হয়েছে; হে সব্যসাচী (অর্জুন), তুমি কেবল নিমিত্ত মাত্র হও।"
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায় (কর্মযোগ)-এর ৩৪ নম্বর শ্লোকটি আমাদের মনস্তত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক সাধনার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্লোকটি হলো:
ইন্দ্রিয়স্যেন্দ্রিয়স্যার্থে রাগদ্বেষৌ ব্যবস্থিতৌ।
তয়োর্ন বশমাগচ্ছেত্তৌ হাস্য পরিপন্থিনৌ।। ৩৪।।
সরলার্থ:
প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়ের নিজস্ব বিষয় (যেমন—চোখের জন্য রূপ, কানের জন্য শব্দ) উপভোগের ক্ষেত্রে আসক্তি (রাগ) এবং বিদ্বেষ (দ্বেষ) আগে থেকেই অবস্থান করে। মানুষের উচিত এই রাগ ও দ্বেষের বশীভূত না হওয়া, কারণ এরা পরমার্থ লাভের পথে প্রধান শত্রু বা প্রতিবন্ধক।
শ্লোকটির মূল শিক্ষা:
ইন্দ্রিয়ের স্বভাব: আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো যখনই কোনো বিষয়ের সংস্পর্শে আসে, তখন হয় আমরা সেটা খুব পছন্দ করি (আসক্তি) অথবা অপছন্দ করি (ঘৃণা)। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
বিবেকের ভূমিকা: ভগবান কৃষ্ণ বলছেন যে, আসক্তি বা বিদ্বেষ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেগুলোর বশীভূত হওয়া যাবে না। যখন আমরা এই আবেগগুলোর দ্বারা পরিচালিত হই, তখনই আমরা ভুল পথে পরিচালিত হই।
শত্রুর পরিচয়: এই শ্লোকে ‘রাগ’ এবং ‘দ্বেষ’—উভয়কেই পরিপন্থিনৌ বা ‘শত্রু’ বলা হয়েছে। এরা সাধকের বিবেকের ওপর পর্দা টেনে দেয় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়।
সহজ উদাহরণ:
আপনার যদি মিষ্টি খেতে খুব ভালো লাগে (আসক্তি), তবে ডায়াবেটিস থাকলেও আপনি তা খেয়ে ফেলবেন। আবার কাউকে অপছন্দ করলে (বিদ্বেষ), তার ভালো কথাটিও আপনি গ্রহণ করবেন না। এই দুই ক্ষেত্রেই আপনি আপনার বুদ্ধির নিয়ন্ত্রণ হারালেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৩৫ নম্বর শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ থেকে বিরত হওয়ার সামাজিক ও মানসিক পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
শ্লোকটি হলো:
ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ।
যেষাং চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা যাস্যসি লাঘবম্।। ৩৫।।
সহজ অর্থ:
যাঁরা তোমাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন (যেমন—ভীষ্ম, দ্রোণ এবং অন্যান্য বীর যোদ্ধারা), তাঁরা মনে করবেন যে তুমি ভয়ের কারণে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছ। এভাবে তাঁদের কাছে তোমার গুরুত্ব বা সম্মান একবারে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
মূল বক্তব্য:
ভুল বোঝাবুঝি: অর্জুন হয়তো দয়া বা করুণার কারণে যুদ্ধ ত্যাগ করতে চাইছিলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে সমাজ বা বিপক্ষ যোদ্ধারা একে 'দয়া' হিসেবে দেখবে না; তারা একে 'কাপুরুষতা' হিসেবে দেখবে।
সম্মানহানি: একজন বীরের কাছে মৃত্যুর চেয়েও অপমানের গ্লানি অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। অর্জুন এ পর্যন্ত যে বীরত্বের খ্যাতি অর্জন করেছেন, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে দিলে তা কলঙ্কিত হবে।
মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি: এখানে কৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্মের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলছেন যে, পলায়ন করলে তিনি নিজের বীরত্বের যে পরিচয় দীর্ঘকাল ধরে তৈরি করেছেন, তা এক নিমেষেই হারিয়ে ফেলবেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের (অর্জুনবিষাদ যোগ) ৩৬ নম্বর শ্লোকের কথা বলছেন। এই শ্লোকে অর্জুনের মনের গভীর দ্বিধা ও অহিংসার মনোভাব ফুটে উঠেছে।
শ্লোকটি হলো:
পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্ হত্বৈতানাততায়িনঃ।
তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুম্ ধার্তরাষ্ট্রান্ স্ববান্ধবান্।।
স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব।। ৩৬।।
শ্লোকের সরল অর্থ:
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন: "এই আততায়ীদের হত্যা করলে আমাদের পাপই স্পর্শ করবে। অতএব, আমাদের নিজেদের আত্মীয় ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করা উচিত নয়। হে মাধব! নিজেদের স্বজনদের হত্যা করে আমরা কীভাবে সুখী হব?"
এই শ্লোকের মূল বিষয়বস্তু:
ধর্মীয় সংকট: অর্জুন এখানে শাস্ত্রের একটি সূক্ষ্ম তর্কের অবতারণা করেছেন। যদিও শাস্ত্র অনুযায়ী আততায়ীকে (যারা বিষ দেয়, ঘরে আগুন দেয় বা জমি কেড়ে নেয়) হত্যা করা দোষের নয়, কিন্তু অর্জুন মনে করছেন যেহেতু তারা তাঁর 'স্বজন', তাই তাদের হত্যা করলে উল্টো পাপ হবে।
অর্জুনের বিষাদ: অর্জুন জয়ের চেয়ে সম্পর্কের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর মতে, যে রাজ্য বা সুখ স্বজনদের রক্তে ভেজা, সেই সুখ আসলে কোনো সুখই নয়।
কৃষ্ণের প্রতি সম্বোধন: এখানে অর্জুন কৃষ্ণকে 'মাধব' (লক্ষ্মীর পতি বা সৌভাগ্যের স্বামী) বলে সম্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ সৌভাগ্যের অধিপতি হয়েও অর্জুনকে কেন এই দুর্ভাগ্যের (কুলক্ষয়) পথে নিতে চাইছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৩৭ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধের ফলাফল নির্বিশেষে লাভবান হওয়ার কথা বলছেন।
শ্লোকটি হলো:
হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ।।
শ্লোকের অর্থ:
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন:
হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং: যুদ্ধে যদি তুমি নিহত হও, তবে তুমি বীরের সদগতি লাভ করে স্বর্গপ্রাপ্ত হবে।
জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্: আর যদি তুমি জয়লাভ করো, তবে এই সমৃদ্ধশালী পৃথিবী ভোগ করবে।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ: অতএব হে কৌন্তেয় (কুন্তিপুত্র), যুদ্ধের জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে উঠে দাঁড়াও।
মূল তাৎপর্য:
এই শ্লোকের মাধ্যমে কৃষ্ণ অর্জুনকে মানসিক দ্বন্দ থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, ক্ষত্রিয়ের ধর্ম পালন করলে কোনো অবস্থাতেই তার ক্ষতি নেই।
১. সাফল্য ও ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে: জয় বা পরাজয়—উভয় ক্ষেত্রেই অর্জুনের প্রাপ্তি নিশ্চিত।
২. কর্তব্য পালন: অর্জুন যখন বিষাদে আক্রান্ত হয়ে যুদ্ধ ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, তখন কৃষ্ণ তাকে মনে করিয়ে দেন যে ফলের চিন্তা না করে স্বধর্ম বা কর্তব্য পালন করাই শ্রেয়।
৩. উৎসাহ প্রদান: এটি একটি জোরালো অনুপ্রেরণামূলক বাণী, যা কাপুরুষতা ত্যাগ করে কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার আহ্বান জানায়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের ৩৮ নম্বর শ্লোকে অর্জুন দুর্যোধন এবং তাঁর সঙ্গীদের মানসিক অবস্থা বর্ণনা করছেন। শ্লোকটি হলো:
যদ্যপ্যেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্।। ৩৮।।
শ্লোকের সরলার্থ
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন: "যদিও লোভে এদের (দুর্যোধনদের) জ্ঞান লুপ্ত হয়েছে, তাই তারা কুলক্ষয়জনিত দোষ এবং মিত্রদ্রোহজনিত পাপ দেখতে পাচ্ছে না—"
মূল ভাবার্থ
লোভের প্রভাব: অর্জুন লক্ষ্য করছেন যে দুর্যোধন এবং তাঁর পক্ষীয় রাজারা রাজ্য ও ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে গেছেন। এই লোভ তাঁদের বিচারবুদ্ধি কেড়ে নিয়েছে।
বিবেচনাবোধের অভাব: অর্জুনের মতে, একটি বংশ বা কুল ধ্বংস করা যে কত বড় অপরাধ এবং বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (মিত্রদ্রোহ) করা যে কত বড় পাপ, সেটা বোঝার মতো মানসিক অবস্থায় কৌরবরা নেই।
অর্জুনের বিষাদ: এখানেই অর্জুনের মহানুভবতা (বা তাঁর মোহাচ্ছন্ন অবস্থার গভীরতা) প্রকাশ পায়। তিনি বোঝাতে চাইছেন যে, প্রতিপক্ষ অবুঝ হতে পারে, কিন্তু তিনি তো সব বোঝেন। তাই জেনে-বুঝে এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া কি ঠিক হবে?
অর্জুন এর পরবর্তী শ্লোকে (৩৯ নম্বর) যুক্তি দেবেন যে, যারা এই পাপের পরিণাম জানে, তাদের অন্তত এই যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা উচিত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায় (কর্মযোগ)-এর ৩৯ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কাম বা বাসনার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন।
শ্লোকটি হলো:
আবৃ্তং জ্ঞানমেতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা।
কামরূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পূরেণানলেন চ।। ৩৯।।
সরলার্থ:
হে কৌন্তেয় (অর্জুন)! জ্ঞানীদের নিত্য শত্রু এই কাম (বাসনা) দ্বারা মানুষের জ্ঞান আবৃত থাকে। এই কাম অগ্নির মতো—যা ভোগ করার দ্বারা কখনো তৃপ্ত হয় না, বরং আরও বৃদ্ধি পায়।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষণীয় দিক:
কামই প্রধান শত্রু: এখানে কামকে 'জ্ঞানীর নিত্য শত্রু' বলা হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে কামকে চিনতে পারে, কিন্তু জ্ঞানীরা জানেন যে এটি অলক্ষ্যে থেকে সবসময় বিবেককে আচ্ছন্ন করে রাখে।
অতৃপ্তির প্রতীক: শ্লোকে কামকে 'অনল' বা আগুনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আগুনে ঘি ঢাললে যেমন তা নেভে না বরং দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে, ইন্দ্রিয় ভোগের মাধ্যমে কামনাকেও তেমন মেটানো যায় না।
জ্ঞানের আবরণ: মানুষের শুদ্ধ জ্ঞান বা বিবেককে এই কামনার মেঘ ঢেকে ফেলে, যার ফলে মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ভুল পথে পরিচালিত হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায় (মোক্ষসন্ন্যাস যোগ)-এর ৪০ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতির তিনটি গুণের (সত্ত্ব, রজ ও তম) সর্বব্যপ্ততা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
শ্লোকটি হলো:
ন তদস্তি পৃথিবীতে বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈর্মুক্তং যদেভিঃ স্যান্মুক্তং ত্রিভির্গুণৈঃ।। ৪০।।
সরলার্থ:
"পৃথিবীতে অথবা স্বর্গে দেবতাদের মধ্যেও এমন কোনো সত্তা বা প্রাণী নেই, যে প্রকৃতিজাত এই তিন গুণ (সত্ত্ব, রজ ও তম) থেকে মুক্ত।"
এই শ্লোক থেকে আমরা যা জানতে পারি:
গুণের আধিপত্য: মানুষ তো বটেই, এমনকি উচ্চতর লোক বা স্বর্গের দেবতাদের ওপরেও প্রকৃতির তিন গুণের প্রভাব রয়েছে। ত্রিগুণের প্রভাবের বাইরে এই মর্ত্যলোকে বা দেবলোকে কেউ নেই।
প্রকৃতি ও জীব: যতক্ষণ পর্যন্ত একটি জীব প্রকৃতির অধীনে থাকে, ততক্ষণ সে এই তিন গুণের কোনো না কোনোটি দ্বারা পরিচালিত হয়।
সাম্যের অভাব: এই তিন গুণের সংমিশ্রণেই জগতের বৈচিত্র্য তৈরি হয়। কেউ বেশি সাত্ত্বিক, কেউ রাজসিক, আবার কেউ তামসিক—কিন্তু এই গুণের ঊর্ধ্বে ওঠা সাধারণ অবস্থায় সম্ভব নয়।
তাৎপর্য:
শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, জগতের প্রতিটি কাজ এবং প্রতিটি মানুষই এই গুণের জালে আবদ্ধ। তাই নিজের স্বভাবজাত কর্ম বা গুণ অনুযায়ী কর্তব্য পালন করাই শ্রেয়। এই শ্লোকটি আসলে পরবর্তী শ্লোকগুলোর (যেখানে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের গুণভিত্তিক কর্মবিভাগ করা হয়েছে) জন্য একটি ভূমিকা হিসেবে কাজ করে।
১. প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদ যোগ): শ্লোক ৪১
এই শ্লোকটি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শুরুতে অর্জুনের বিষাদ ও উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
শ্লোক: অধর্ম্যাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদ্যুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ ।
স্ত্রীষু দুষ্টাশু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ।। ৪১ ।।
সরলার্থ: হে কৃষ্ণ! অধর্মের প্রাবল্যে কুলস্ত্রীরা ব্যভিচারিণী হয়। হে বার্ষ্ণেয় (বৃষ্ণিবংশজাত কৃষ্ণ)! স্ত্রীরা দুশ্চরিত্রা হলে 'বর্ণসঙ্কর' সন্তান উৎপন্ন হয়।
২. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্য যোগ): শ্লোক ৪১
এটি গীতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্লোক, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মনঃসংযোগ এবং সংকল্পের কথা বলেছেন।
শ্লোক: ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিহিকেহ কুরুবিন্দন ।
বহুশাখা হ্যনন্তাশ্চ বুদ্ধয়োহব্যবসায়িনাম্ ।। ৪১ ।।
সরলার্থ: হে কুরুবিন্দন (অর্জুন)! যারা এই ভক্তিপথে রয়েছেন, তাদের বুদ্ধি বা লক্ষ্য একনিষ্ঠ (একমুখী)। কিন্তু যাদের বুদ্ধি স্থির নয়, তাদের লক্ষ্য অগণিত শাখায় বিভক্ত এবং অন্তহীন।
৩. ১৮তম অধ্যায় (মোক্ষসন্ন্যাস যোগ): শ্লোক ৪১
এখানে চতুর্বর্ণের স্বভাব ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
শ্লোক: ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ ।। ৪১ ।।
সরলার্থ: হে পরন্তপ! ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্মসমূহ তাদের স্বভাবজাত গুণের (সত্ত্ব, রজ ও তম) দ্বারা বিভাজিত হয়েছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা একটি বিশাল গ্রন্থ যা ১৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত এবং এতে মোট ৭০০টি শ্লোক রয়েছে। আপনি যেহেতু নির্দিষ্ট করে "৪২ নম্বর শ্লোক" এর কথা বলেছেন, তাই সম্ভবত আপনি অর্জুন বিষাদযোগ (প্রথম অধ্যায়) অথবা সাংখ্যযোগ (দ্বিতীয় অধ্যায়) এর কথা বলছেন।
নিচে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর ৪২ নম্বর শ্লোক ও তার সারমর্ম দেওয়া হলো:
১. প্রথম অধ্যায় (অর্জুন বিষাদযোগ) - শ্লোক ৪২
অর্জুন যখন কুরুক্ষেত্রের ময়দানে বিষাদগ্রস্ত হয়ে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করছিলেন, তখন তিনি কুলক্ষয়ের কুফল সম্পর্কে বলছিলেন:
সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ।
পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ।। ৪২।।
সরলার্থ: কুলবিনাশকারীদের এই বর্ণসংকর অবস্থা কুলকে এবং কুলঘাতকদের নরকে নিয়ে যায়। এদের পিতৃপুরুষেরা শ্রাদ্ধ ও তর্পণ (অন্ন ও জল) না পেয়ে অধঃপতিত হন।
প্রসঙ্গ: অর্জুন এখানে সামাজিক ও পারিবারিক প্রথার বিলুপ্তি নিয়ে তার আশঙ্কার কথা বলছেন।
২. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ) - শ্লোক ৪২
এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মোহ দূর করার জন্য কথা বলা শুরু করেছেন। ৪২ নম্বর শ্লোকটি এখানে কাম্য কর্মে আসক্ত ব্যক্তিদের বর্ণনা করে:
যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ।
বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদস্তীতি বাদিনঃ।। ৪২।।
সরলার্থ: হে পার্থ! যারা অল্পজ্ঞানী, যারা বেদের ফলশ্রুতিবাক্যে (স্বর্গসুখ ইত্যাদি) অত্যন্ত আসক্ত এবং যারা মনে করে যে এর বাইরে আর কিছু নেই, তারা অত্যন্ত মনোরম ও পুষ্পিত বাক্য বলে থাকে।
প্রসঙ্গ: এখানে শ্রীকৃষ্ণ কেবল জাগতিক সুখ বা স্বর্গলাভের জন্য যারা আরাধনা করে, তাদের "অবিপশ্চিত" বা বিবেকহীন বলে অভিহিত করেছেন।
৩. চতুর্থ অধ্যায় (জ্ঞানযোগ) - শ্লোক ৪২
এই অধ্যায়ের শেষ শ্লোকটি (৪২ নম্বর) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে কৃষ্ণ অর্জুনকে কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দিচ্ছেন:
তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনা ত্মনঃ।
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত।। ৪২।।
সরলার্থ: অতএব হে ভারত (অর্জুন)! তোমার হৃদয়ে স্থিত অজ্ঞানপ্রসূত এই সংশয়কে জ্ঞানের খড়্গ দিয়ে ছেদন করো এবং কর্মযোগ অবলম্বন করে যুদ্ধের জন্য উঠে দাঁড়াও।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা একটি বিশাল গ্রন্থ যা ১৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত। আপনি যখন "৪৩ নম্বর শ্লোক" বলছেন, তখন এটি কোন অধ্যায়ের শ্লোক তা নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। তবে, গীতার দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ৪৩ নম্বর শ্লোক নিচে আলোচনা করা হলো, যা আপনার জিজ্ঞাসার কারণ হতে পারে:
১. তৃতীয় অধ্যায় (কর্মযোগ): শ্লোক ৪৩
এটি এই অধ্যায়ের শেষ শ্লোক, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কাম (ইচ্ছা) ও ইন্দ্রিয়জয়ের চূড়ান্ত উপায় বলছেন।
শ্লোক: এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধ্বা সংস্তভ্যাত্মানমাত্মনা।
জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্।।
সরলার্থ: হে মহাবাহো! বুদ্ধির অতীত সেই পরমাত্মাকে জেনে নিশ্চলা বুদ্ধি দ্বারা মনকে স্থির করো এবং কামরূপ দুর্জয় শত্রুকে বিনাশ করো।
তাৎপর্য: এখানে আত্মসংযম এবং বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে আসক্তি দূর করার কথা বলা হয়েছে।
২. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ): শ্লোক ৪৩
এই শ্লোকে কৃষ্ণ তাদের সমালোচনা করেছেন যারা কেবল বেদের সকাম কর্মে (ফলের আশায় করা কাজ) মগ্ন থাকে।
শ্লোক: কামত্মনঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্।
ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি।।
সরলার্থ: তারা কামনাসক্ত এবং তাদের লক্ষ্য স্বর্গলাভ। তারা এমন সব কাজ করে যা কেবল পুনর্জন্ম এবং ভোগ-ঐশ্বর্য লাভের পথ প্রশস্ত করে।
তাৎপর্য: এখানে ভগবান বোঝাতে চেয়েছেন যে, কেবল জাগতিক সুখ বা স্বর্গের আশায় ধর্ম পালন করা প্রকৃত মুক্তি নয়।
৩. একাদশ অধ্যায় (বিশ্বরূপ দর্শন যোগ): শ্লোক ৪৩
এখানে অর্জুন বিশ্বরূপ দেখার পর ভগবানের স্তুতি করছেন।
শ্লোক: পিতা সি লোকস্য চরাচরস্য...
সরলার্থ: আপনি এই স্থাবর-জঙ্গম ও সমগ্র জগতের পিতা, পূজনীয় এবং পরম গুরু। এই ত্রিভুবনে আপনার সমান কেউ নেই, আপনার চেয়ে বড় হওয়া তো অসম্ভব।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ৪৪ নম্বর শ্লোক আসলে প্রতিটি অধ্যায়ে আলাদা আলাদা রয়েছে। তবে আপনি সম্ভবত দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৪৪ নম্বর শ্লোকটির কথা বলছেন, কারণ এটি আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
শ্লোকটি হলো:
ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম্।
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ না বিধীয়তে।।
সরল অর্থ:
যারা ভোগ-বিলাস এবং ঐশ্বর্যের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত এবং সেই সব বস্তুর দ্বারা যাদের চিত্ত বা মন বিভ্রান্ত হয়েছে, তাদের বুদ্ধি পরমেশ্বরে বা আত্মতত্ত্বে একাগ্র (নিশ্চয়াত্মিকা) হয় না। অর্থাৎ, তারা গভীর সমাধি বা একাগ্রতা লাভ করতে পারে না।
মূল বিশ্লেষণ:
ভোগ ও ঐশ্বর্য: যখন আমাদের মন কেবল জাগতিক সুখ এবং ক্ষমতার পেছনে ছোটে, তখন আমাদের বিচারবুদ্ধি ঘোলাটে হয়ে যায়।
অপহৃতচেতসাম্: এর অর্থ হলো যাদের বিবেক বা কাণ্ডজ্ঞান ‘অপহৃত’ বা চুরি হয়ে গেছে। মোহের বশবর্তী হয়ে তারা সঠিক পথ চিনতে পারে না।
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি: এর অর্থ হলো ‘স্থির বা একমুখী বুদ্ধি’। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বারবার লক্ষ্যস্থির করতে বলেছেন। কিন্তু ভোগবিলাসে মত্ত থাকলে সেই স্থিরতা আসে না।
সমাধি: এখানে সমাধি মানে কেবল যোগাসনে বসে থাকা নয়, বরং ঈশ্বরের চিন্তায় বুদ্ধির সমতা বা স্থিরতা আনা।
সারকথা: আপনি যদি কোনো মহান লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান (সেটা আধ্যাত্মিক হোক বা জাগতিক), তবে মনের চঞ্চলতা বা কেবল ইন্দ্রিয়সুখের নেশা থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখা জরুরি। মন বিক্ষিপ্ত থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বিভিন্ন অধ্যায়ে ৪৫ নম্বর শ্লোক রয়েছে, তবে আপনি সম্ভবত দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৪৫ নম্বর শ্লোকটির কথা বলছেন, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই শ্লোকটি হলো:
ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভব অর্জুন।
নিদ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্।। ৪৫।।
সরলার্থ:
বেদসমূহ (সকাম কর্মের প্রেক্ষিতে) প্রকৃতির তিনটি গুণ (সত্ত্ব, রজ ও তম) বিষয়ক। হে অর্জুন, তুমি এই তিন গুণের ঊর্ধ্বে যাও। তুমি সুখ-দুঃখ আদি দ্বন্দ্বে বিচলিত না হয়ে, নিত্যবস্তুতে (পরমাত্মায়) স্থিত হয়ে এবং লাভ-ক্ষতির (যোগ-ক্ষেম) চিন্তা ত্যাগ করে আত্মনিষ্ঠ হও।
মূল বিষয়বস্তু ও ব্যাখ্যা:
বেদের বিষয়বস্তু ও গুণ: এখানে কৃষ্ণ বলছেন যে, বেদের কর্মকাণ্ডের অংশগুলো মূলত প্রাকৃতিক তিন গুণের প্রভাবে হওয়া জাগতিক প্রাপ্তি নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু প্রকৃত আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য এই গুণের গণ্ডি পেরোনো প্রয়োজন।
নিস্ত্রৈগুণ্য ভব: অর্জুনকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে যেন তিনি গুণাতীত হন। অর্থাৎ, জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে যেন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ হন।
নিদ্বন্দ্ব (দ্বন্দ্বরহিত): জয়-পরাজয়, শীত-উষ্ণ বা মান-অপমানের মতো দ্বৈত অনুভূতিগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
নির্যোগক্ষেম: ‘যোগ’ মানে যা নেই তা অর্জন করা, আর ‘ক্ষেম’ মানে যা আছে তা রক্ষা করা। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন এই দুশ্চিন্তা ত্যাগ করে কেবল নিজের ‘আত্মা’ বা স্বরূপের দিকে মনোনিবেশ করতে।
কেন এই শ্লোকটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই শ্লোকটি কর্মযোগের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। এটি শেখায় যে, আমরা যখন কোনো কাজ করি, তখন যদি ফলাফলের গুণাগুণ বা লাভ-ক্ষতি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকি, তবে আমরা প্রকৃতির জালে আটকে যাই। প্রকৃত মুক্তি বা শান্তি আসে কেবল নিঃস্বার্থভাবে নিজের কর্তব্যে অবিচল থাকলে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ১৮টি অধ্যায় রয়েছে, তাই আপনি সম্ভবত নির্দিষ্ট কোনো অধ্যায়ের ৪৬ নম্বর শ্লোকের কথা বলছেন। তবে সাধারণত '৪৬ নম্বর শ্লোক' বললে পাঠকরা প্রথম অধ্যায় (অর্জুনবিষাদ যোগ) অথবা দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাংখ্য যোগ) কথা বেশি আলোচনা করেন।
নিচে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ৪৬ নম্বর শ্লোকের সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
১. প্রথম অধ্যায়: অর্জুনবিষাদ যোগ (শ্লোক ৪৬)
অর্জুন যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের দেখে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন, তখন তিনি বলেছিলেন:
যদি মামপ্রতীকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ।
ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেৎ।।
সরলার্থ: অর্জুন বলছেন, "শস্ত্রধারী ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা যদি নিরস্ত্র ও বিমুখ অবস্থায় আমাকে এই রণক্ষেত্রে হত্যা করে, তবে সেটিও আমার জন্য পরম মঙ্গলজনক হবে।"
তাৎপর্য: এখানে অর্জুনের চরম মানসিক দ্বন্দ্ব এবং বৈরাগ্য ফুটে উঠেছে। তিনি যুদ্ধ করার চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করছিলেন।
২. দ্বিতীয় অধ্যায়: সাংখ্য যোগ (শ্লোক ৪৬)
কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে কর্মযোগ ও জ্ঞানের শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন তিনি বেদের সার্থকতা নিয়ে এই বিখ্যাত কথাটি বলেন:
যাবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সংপ্লুতোদকে।
তাবান সর্বেষু বেদেষু ব্রাহ্মণস্য বিজানতঃ।।
সরলার্থ: "চারিদিকে বিশাল জলাশয় থাকলে একটি ছোট কূপের যেমন বিশেষ প্রয়োজন থাকে না, তেমনি যিনি পরমাত্মাকে জেনেছেন, তাঁর কাছে বেদের কর্মকাণ্ডের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা থাকে না।"
তাৎপর্য: কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে, ক্ষুদ্র জলাশয়ের কাজ যেমন মহাসমুদ্র দিয়ে মিটে যায়, তেমনি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলে বেদের ছোটখাটো আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে ওঠা সম্ভব।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৭ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয়। এটি মূলত 'কর্মযোগ'-এর মূল ভিত্তি।
শ্লোকটি হলো:
কর্মণ্যেবাধিকারাস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি॥
শ্লোকটির সহজ অর্থ:
আপনার কেবল কর্ম করার অধিকার আছে, কিন্তু সেই কর্মের ফলের ওপর কোনো অধিকার নেই। ফলের আশা করে কর্ম করবেন না, আবার কর্মত্যাগেও যেন আপনার আসক্তি না থাকে।
শ্লোকটির চারটি মূল শিক্ষা:
১. কর্তব্য পালন: আপনার প্রধান মনোযোগ হওয়া উচিত আপনার কাজ বা কর্তব্যের ওপর। ২. ফলাফলে অনাসক্তি: কাজের ফল কী হবে (লাভ না কি ক্ষতি), তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করলে কাজের মান নষ্ট হয়। তাই ফল ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দিয়ে কাজ করে যেতে হবে। ৩. অহংকার ত্যাগ: "আমিই এই কাজের ফলদাতা"—এই মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। ৪. অলসতা বর্জন: ফলের ওপর অধিকার নেই শুনে কাজ বন্ধ করে দেওয়া চলবে না। কর্মহীন বা অলস হয়ে থাকাও অনুচিত।
কেন এটি আধুনিক জীবনে প্রয়োজনীয়?
বর্তমানে আমরা অনেক সময় কাজের ফলের কথা ভেবে এতটাই উদ্বিগ্ন থাকি যে, বর্তমানের কাজটিতে ঠিকমতো মন দিতে পারি না। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আমরা যদি মনোযোগ দিয়ে সঠিক কাজটি করি, তবে মানসিক শান্তি বজায় রাখা এবং সফল হওয়া—উভয়ই সহজ হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৮ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ 'যোগ'-এর প্রকৃত সংজ্ঞা এবং কর্ম করার সঠিক পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছেন।
শ্লোকটি হলো:
যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয়।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে।।
সরলার্থ ও বিশ্লেষণ
এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তিনটি প্রধান উপদেশ দিয়েছেন:
আসক্তি বর্জন (সঙ্গং ত্যক্ত্বা): কর্মের ফলের প্রতি বা "আমি করছি" এই অহংকারের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে কর্ম করতে হবে।
সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে সমান থাকা: কর্মের ফল সফল হোক বা বিফল (সিদ্ধি বা অসিদ্ধি), উভয় পরিস্থিতিতেই মনকে বিচলিত হতে না দিয়ে স্থির রাখা।
সমত্বই যোগ: জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি বা সুখ-দুঃখের সময় মনের এই যে সাম্যাবস্থা বা স্থিরতা, তাকেই 'যোগ' বলা হয়।
কেন এই শ্লোকটি গুরুত্বপূর্ণ?
সাধারণত আমরা কোনো কাজ করার সময় তার ফলাফল নিয়ে চিন্তিত থাকি। যদি ফল ভালো হয় আমরা আনন্দিত হই, আর খারাপ হলে ভেঙে পড়ি। শ্রীকৃষ্ণ এখানে শেখাচ্ছেন যে, কর্মফল আমাদের হাতে নেই, কিন্তু কর্ম করার ভঙ্গিটি আমাদের হাতে। যখন আমরা ফলাফলের চিন্তা ছেড়ে কেবল কর্তব্যের খাতিরে কাজ করি, তখনই আমরা প্রকৃত শান্তি পাই।
দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক ৪৯:
দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ধনঞ্জয়।
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ।।
সরলার্থ:
হে ধনঞ্জয় (অর্জুন)! বুদ্ধিযোগের (নিষ্কাম কর্ম বা সমত্ববুদ্ধি) তুলনায় সकाम কর্ম (ফল লাভের আশায় করা কাজ) অত্যন্ত নিম্নমানের। তাই তুমি বুদ্ধির (সমত্ববুদ্ধি বা পরমাত্মার চরণে) আশ্রয় গ্রহণ করো। যারা কেবল ফলের আশা নিয়ে কাজ করে, তারা অত্যন্ত কৃপণ (অর্থাৎ তারা প্রকৃত সুখ থেকে বঞ্চিত হয়)।
শ্লোকটির মূল শিক্ষা:
কর্ম বনাম ফল: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কাজ করার সময় ফলের চিন্তা করলে কাজের গুণমান কমে যায় এবং তা মনের অশান্তির কারণ হয়।
বুদ্ধিযোগের গুরুত্ব: এখানে 'বুদ্ধি' বলতে আত্মজ্ঞান বা ঈশ্বরের চরণে সমর্পিত বুদ্ধিকে বোঝানো হয়েছে। এই বুদ্ধিতে স্থির হয়ে কাজ করলে মানুষ বন্ধনমুক্ত হয়।
কৃপণ কারা?: যারা অত্যন্ত সংকীর্ণমনা এবং কেবল নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ বা বৈষয়িক লাভের আশায় কাজ করে, তাদের এখানে 'কৃপণ' বলা হয়েছে। কারণ তারা অসীম আনন্দ ছেড়ে তুচ্ছ লাভের পেছনে ছুটছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৫০ নম্বর শ্লোক কর্মযোগের প্রসঙ্গে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল আলোচিত।
শ্লোকটি হলো:
বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে।
তস্মাদ্যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্।। ২/৫০।।
সরলার্থ
যিনি সমত্ববুদ্ধি সম্পন্ন (অর্থাৎ পরমেশ্বরে নিবিষ্টচিত্ত), তিনি এই জন্মেই পুণ্য ও পাপ—উভয়কেই ত্যাগ করেন। অতএব, তুমি সেই সমত্বরূপ যোগের অনুশীলন করো। কর্মে নিপুণতাই হলো যোগ।
মূল শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:
পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে: সাধারণ মানুষ ফলের আশায় কর্ম করে যা তাদের কর্মফলের জালে (পাপ বা পুণ্য) আবদ্ধ করে। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি ফলত্যাগ করে কর্ম করেন বলে তিনি এই বন্ধন থেকে মুক্ত থাকেন।
যোগঃ কর্মসু কৌশলম্: এটি গীতার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উক্তি। এর অর্থ হলো—কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার কৌশলই হলো যোগ। অর্থাৎ, কর্ম না ছেড়ে বরং ফলের আশা ত্যাগ করে ঈশ্বরদত্ত কর্তব্য পালনের মাধ্যমে কর্ম করাই হলো প্রকৃত চাতুর্য বা কৌশল।
কর্মফলের বিনাশ: যখন মানুষ নিরাসক্ত হয়ে কাজ করে, তখন তার কর্ম আর নতুন কোনো সংস্কার বা জন্ম-মৃত্যুর কারণ তৈরি করে না।
@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

0 Comments