শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-51-75 ( শ্লোক) শব্দার্থ (Word Meaning)

 



শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-51-75 ( শ্লোক) শব্দার্থ 
(Word Meaning)


কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ

 জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্ ৫১

সহজ অর্থ:

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেনসমত্ববুদ্ধি সম্পন্ন জ্ঞানী ব্যক্তিরা কর্মফল ত্যাগ করে জন্ম-মৃত্যুরূপ বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং সমস্ত দুঃখ-কষ্টহীন পরম পদ (মোক্ষ) প্রাপ্ত হন


এই শ্লোকের মূল শিক্ষা:

ফল ত্যাগ: কর্ম না করা নয়, বরং কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ

জন্মবন্ধ মুক্তি: আমরা যখন ফলের আশায় কাজ করি, তখন সেই কর্ম আমাদের সংসারের মায়ায় বেঁধে রাখে কিন্তুনিষ্কামভাবে কাজ করলে সেই বাঁধন ছিঁড়ে যায়

পরম পদ: এর মাধ্যমে মানুষ এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় যেখানে কোনো রোগ, শোক বা অশান্তি নেই (অনাময় পদ)

আপনি কি অন্য কোনো অধ্যায়ের ৫১ নম্বর শ্লোক সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন?

গীতার প্রতিটি অধ্যায়ের শ্লোক সংখ্যা আলাদা যেমন:

১৮ নম্বর অধ্যায়ের ৫১ নম্বর শ্লোক: এখানে বিশুদ্ধ বুদ্ধির দ্বারা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আধ্যাত্মিক মার্গে চলার কথা বলা হয়েছে

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে (সাংখ্যযোগ) ৫২ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শ্লোকটি হলো:

যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি

তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য ।। ৫২।।

সরলার্থ:

"যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ কলুষতাকে (বা পিচ্ছিল পথকে) অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা শুনেছ এবং যা শুনতে বাকি আছেসেইসব ভোগবিষয়ক শাস্ত্রবাক্য বা ফলাকাঙ্ক্ষা থেকে বৈরাগ্য লাভ করবে"


মূল প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা:

মোহমুক্তি: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে, মানুষের বুদ্ধি যখন অবিদ্যা বা মোহ (ভ্রান্তি) থেকে মুক্ত হয়, তখন সে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে এখানে 'মোহ' বলতে দেহাত্মবোধ এবং জাগতিক মায়ার প্রতি আসক্তিকে বোঝানো হয়েছে

নির্বেদ বা বৈরাগ্য: যখন বুদ্ধি স্বচ্ছ হয়, তখন মানুষ জাগতিক লাভের কথা বলে এমন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা কথা (যা 'শ্রুতস্য' বা আগে শোনা হয়েছে এবং 'শ্রোতব্যস্য' বা যা ভবিষ্যতে শোনার সম্ভাবনা আছে) থেকে উদাসীন হয়ে যায়

আধ্যাত্মিক পরিপক্কতা: এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে, আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি স্তরে পৌঁছালে বাহ্যিক শাস্ত্রীয় জটিলতা বা লৌকিক ফলশ্রুতির আর প্রয়োজন থাকে না তখন মন স্থির হয় পরমাত্মার সন্ধানে

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

এটি আমাদের শেখায় যে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা বা আচার-সর্বস্ব ধর্ম যথেষ্ট নয় বুদ্ধিকে যখন আমরা মায়ার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারি, তখনই প্রকৃত স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে ৫৩ নম্বর শ্লোক নেই ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে কেবল মাত্র ২য়, ৬ষ্ঠ, ১১শ এবং ১৮শ অধ্যায়ে ৫৩ নম্বর শ্লোকটি পাওয়া যায়

আপনার জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে এই চারটি অধ্যায়ের ৫৩ নম্বর শ্লোকগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সারমর্ম নিচে দেওয়া হলো:

. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ)

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বুদ্ধির স্থিরতা সম্পর্কে বলছেন:

শ্লোক: শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা

সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি

সরলার্থ: নানাবিধ শাস্ত্রবাক্য শুনে তোমার বুদ্ধি যখন আর বিচলিত হবে না এবং পরমাত্মায় স্থির নিশ্চল হবে, তখনই তুমি প্রকৃত যোগ বা আত্মতত্ত্ব লাভ করবে

. ষষ্ঠ অধ্যায় (আত্মসংযমযোগ)

এই অধ্যায়ে ৪৭টি শ্লোক রয়েছে, তবে কিছু সংস্করণে পাঠভেদে সংখ্যা সামান্য এদিক-সেদিক হতে পারে সাধারণত প্রামাণিক সংস্করণে এই অধ্যায়ে ৪৭টি শ্লোকই গণ্য করা হয়

. একাদশ অধ্যায় (বিশ্বরূপদর্শনযোগ)

বিশ্বরূপ দেখার পর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভক্তির মহিমা বোঝাচ্ছেন:

শ্লোক: নাহং বেদৈর্ন তপসা দানেন চেজ্যয়া

শক্য এবংবিধো দ্রষ্টুং দৃষ্টবানসি মাং যথা

সরলার্থ: তুমি আমার যে রূপ দেখলে, তা কেবল বেদ পাঠ, তপস্যা, দান বা যজ্ঞের দ্বারা দেখা সম্ভব নয় অর্থাৎ, অনন্য ভক্তি ছাড়া এই রূপ দর্শন দুর্লভ

. অষ্টাদশ অধ্যায় (মোক্ষসন্ন্যাসযোগ)

এখানে ত্যাগের চরম অবস্থা ব্রহ্মভাব প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে:

শ্লোক: অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্

 বিমুচ্য নির্মলঃ শান্তো ব্রহ্মভূয়ায় বলতে

সরলার্থ: যিনি অহংকার, বল, দর্প, কাম, ক্রোধ এবং সঞ্চয় বুদ্ধি ত্যাগ করেছেন, তিনিই মমতাবিহীন শান্ত হয়ে ব্রহ্মভাব লাভের যোগ্য হন

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বিভিন্ন অধ্যায়ে ৫৪ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তবে আপনি নির্দিষ্ট কোনো অধ্যায়ের কথা উল্লেখ না করায়, গীতার সবচেয়ে পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ দুটি অধ্যায়ের ৫৪ নম্বর শ্লোক নিচে দেওয়া হলো:

. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ) - শ্লোক ৫৪

অর্জুন যখন স্থিতপ্রজ্ঞ বা স্থিরবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তির লক্ষণ জানতে চেয়েছিলেন, তখন এই শ্লোকটি বলেছিলেন:

অর্জুন উবাচ স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থস্য কেশব

স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্রজেত কিম্ ৫৪

সরলার্থ: অর্জুন বললেনহে কেশব! সমাধিতে স্থিত স্থিরবুদ্ধি ব্যক্তির লক্ষণ কী? স্থিতধী ব্যক্তি কীভাবে কথা বলেন? তিনি কীভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা চলেন? (অর্থাৎ তাঁর আচরণ কেমন?)


. অষ্টাদশ অধ্যায় (মোক্ষসন্ন্যাসযোগ) - শ্লোক ৫৪

ভক্তিযোগের চরম উৎকর্ষ এবং ব্রহ্মভাব প্রাপ্তির বর্ণনা এই শ্লোকে পাওয়া যায়:

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা শোচতি কাঙ্ক্ষতি

সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্ ৫৪

সরলার্থ: যিনি ব্রহ্মভাবে স্থিত প্রসন্নচিত্ত, তিনি কোনো কিছুর জন্য শোক করেন না

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে ৫৫ নম্বর শ্লোক নেই গীতার ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে মাত্র ৫টি অধ্যায়ে (, , ১১, ১৮ এবং ১০ নম্বর অধ্যায়ে বিভূতিযোগের সমাপ্তি বিবেচনায়) এই সংখ্যার শ্লোক পাওয়া যায়

তবে আপনার জিজ্ঞাসার প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ) এবং অষ্টাদশ অধ্যায় (মোক্ষযোগ)-এর ৫৫ নম্বর শ্লোক দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিচে এই দুটি শ্লোকের অর্থ তাৎপর্য দেওয়া হলো:


. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ), শ্লোক ৫৫

এটিস্থিতপ্রজ্ঞবা স্থিতধী ব্যক্তির লক্ষণ বর্ণনা করে

শ্রীভগবানুবাচপ্রজহাতি যদা কামান্ সর্বান্ পার্থ মনোগতান্

 আত্মন্যেজাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে।। ৫৫।।

সরলার্থ: শ্রীভগবান বললেনহে পার্থ! মানুষ যখন মনের সমস্ত কামনা-বাসনা বর্জন করে নিজের আত্মার দ্বারাই নিজের আত্মাতে তুষ্ট থাকেন, তখনই তাঁকে 'স্থিতপ্রজ্ঞ' বলা হয়

তাৎপর্য: এখানে প্রকৃত সুখের উৎস যে বাইরের বিষয়ে নয়, বরং নিজের অন্তরেতা বোঝানো হয়েছে


. অষ্টাদশ অধ্যায় (মোক্ষযোগ), শ্লোক ৫৫

এটি ভক্তির মাধ্যমে ভগবানকে জানার পরম রহস্য ব্যাখ্যা করে

ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ

ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্।। ৫৫।।

সরলার্থ: ভক্তির মাধ্যমেই কেবল আমাকে তত্ত্বত (যথাযথভাবে) জানা সম্ভব যেআমি কে এবং আমার স্বরূপ কী এইভাবে ভক্তির দ্বারা আমাকে তত্ত্বত জানার পর তিনি আমাতেই প্রবেশ করেন (অর্থাৎ ভগবদ্ভাব প্রাপ্ত হন)

তাৎপর্য: কর্ম জ্ঞানের চেয়েও ভক্তিকে এখানে ঈশ্বর লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে


. ষষ্ঠ অধ্যায় (ধ্যানযোগ), শ্লোক ৫৫ (পাণ্ডব গীতা বা পাঠভেদে ভিন্ন হতে পারে)

ষষ্ঠ অধ্যায়েও ৪৭টি শ্লোক রয়েছে, তবে কিছু সংস্করণে যোগসাধনার গভীর স্তরের কথা আলোচিত হয় সাধারণত ২য় ১৮শ অধ্যায়ের শ্লোকগুলোই বেশি আলোচিত

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে ৫৬ নম্বর শ্লোক নেই ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে মাত্র ৫টি অধ্যায়ে ৫৬ বা তার বেশি শ্লোক রয়েছে আপনি সম্ভবত দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫৬ নম্বর শ্লোকটির কথা বলছেন, যা অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং 'স্থিতপ্রজ্ঞ' বা স্থিতধী ব্যক্তির লক্ষণ বর্ণনা করে

শ্লোকটি নিচে দেওয়া হলো:

শ্লোক (.৫৬):

দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ

বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে


শব্দার্থ সরল ব্যাখ্যা:

দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ: যাঁর মন দুঃখে বিচলিত বা উদ্বিগ্ন হয় না

সুখেষু বিগতস্পৃহঃ: সুখে যাঁর কোনো লালসা বা আসক্তি নেই

বীতরাগভয়ক্রোধঃ: যিনি আসক্তি (রাগ), ভয় এবং ক্রোধ থেকে মুক্ত

স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে: তাঁকেই স্থিতধী বা স্থিরবুদ্ধি সম্পন্ন মুনি বলা হয়

সারমর্ম:

এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জানাচ্ছেন যে, প্রকৃত জ্ঞানী বা স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি হলেন তিনি, যিনি জীবনের চরম প্রতিকূলতায় (দুঃখে) ভেঙে পড়েন না এবং অনুকূল অবস্থায় (সুখে) অতিশয় আনন্দিত বা অহংকারী হন না ভয়, রাগ এবং মোহের ঊর্ধ্বে উঠে যিনি মনের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন, তিনিই প্রকৃত যোগী


অন্যান্য অধ্যায় যেখানে ৫৬ নম্বর শ্লোক আছে:

 . প্রথম অধ্যায়: এখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রস্তুতি শঙ্খধ্বনির বর্ণনা রয়েছে

 . ষষ্ঠ অধ্যায়: ধ্যানযোগের বিভিন্ন নিয়ম মনের একাগ্রতা নিয়ে আলোচনা

. একাদশ অধ্যায়: বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুনের ব্যাকুলতা ভগবানের অভয়বাণী

. অষ্টাদশ অধ্যায়: মোক্ষযোগ বা কর্মফল ত্যাগের মাধ্যমে পরমেশ্বরের সান্নিধ্য লাভ

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বিভিন্ন অধ্যায়ে ৫৭ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবনমুখী শিক্ষা প্রদান করে যেহেতু গীতায় মোট ১৮টি অধ্যায় রয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের ৫৭ নম্বর শ্লোকের সারমর্ম নিচে তুলে ধরা হলো:

১৮তম অধ্যায় (মোক্ষসন্ন্যাস যোগ), শ্লোক ৫৭

এটি গীতার অন্যতম প্রসিদ্ধ ৫৭ নম্বর শ্লোক এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কর্মযোগের চরম শিক্ষা দিয়েছেন:

চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ

বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।।

সরলার্থ: তুমি চিত্তের দ্বারা সমস্ত কর্ম আমাতে অর্পণ করে, আমাপরায়ণ হয়ে এবং বুদ্ধিযোগ অবলম্বন করে সর্বদা আমাতে নিবিষ্টচিত্ত হও অর্থাৎ, ফলাফলের চিন্তা না করে ঈশ্বরে বিশ্বাস রেখে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে


২য় অধ্যায় (সাংখ্য যোগ), শ্লোক ৫৭

এই শ্লোকে 'স্থিতপ্রজ্ঞ' বা স্থিরবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তির লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে:

যঃ সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্

নাভিনন্দতি দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।

সরলার্থ: যার কোনো কিছুতেই আসক্তি নেই, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বা অশুভ প্রাপ্তিতে দ্বেষ করেন না, তাঁর বুদ্ধিই স্থির বা প্রতিষ্ঠিত


১১শ অধ্যায় (বিশ্বরূপ দর্শন যোগ), শ্লোক ৫৭

এই অধ্যায়ে অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখে অভিভূত, তখন এই শ্লোকটি (সঞ্জয় উবাচ) পরিস্থিতির বর্ণনা দেয়:

ইত্যর্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ

আশ্বাসয়ামাস ভীতমেনং ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা।।

সরলার্থ: বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই প্রকার বলে পুনরায় নিজের (চতুর্ভুজ দ্বিভুজ) রূপ প্রদর্শন করলেন মহাত্মা কৃষ্ণ পুনরায় সৌম্যমূর্তি ধারণ করে ভীত অর্জুনকে আশ্বস্ত করলেন


সংক্ষেপে মূল শিক্ষা:

আপনি যদি ভক্তি বা কর্মের কথা চিন্তা করেন, তবে ১৮তম অধ্যায়ের ৫৭ নম্বর শ্লোকটি দৈনন্দিন জীবনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক, যেখানে সমস্ত কাজ ঈশ্বরকে সমর্পণ করে মানসিক শান্তি খোঁজার পথ দেখানো হয়েছে

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে ৫৮ নম্বর শ্লোক নেই (কারণ অনেক অধ্যায়ের শ্লোক সংখ্যা ৫৮-এর কম) তবে যে অধ্যায়গুলোতে ৫৮ নম্বর শ্লোক রয়েছে, তার মধ্যে দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৫৮ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বহুল পঠিত

আপনি সম্ভবত এই শ্লোকটির কথাই বলছেন:

যদা সংহরতে চায়ং কূর্মোঽঙ্গানীব সর্বশঃ

 ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।। (/৫৮)

শ্লোকটির সরলার্থ:

কচ্ছপ যেমন বিপদের সংকেত পেলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে নিজের শক্ত খোলসের ভেতরে গুটিয়ে নেয়, ঠিক তেমনি যখন কোনো ব্যক্তি তার ইন্দ্রিয়গুলোকে (চোখ, কান, জিহ্বা ইত্যাদি) তাদের বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণভাবে গুটিয়ে নিতে পারেন, তখন তাকে 'স্থিতপ্রজ্ঞ' বা স্থির বুদ্ধিমান বলা হয়

মূল শিক্ষা:

আত্মসংযম: কচ্ছপের উদাহরণটি দেওয়া হয়েছে কারণ সে চাইলেই তার পা বা মাথা বের করতে পারে আবার গুটিয়ে নিতে পারে একজন সাধককেও তেমন হতে হবেপ্রয়োজনে ইন্দ্রিয় ব্যবহার করবেন, কিন্তু ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত হবেন না

আসক্তি মুক্তি: বাইরের জগতের প্রলোভন থেকে মনকে সরিয়ে নিয়ে নিজের ভেতরে (আত্মায়) নিমগ্ন হওয়ার ক্ষমতা অর্জনই এই শ্লোকের মূল লক্ষ্য


অন্যান্য অধ্যায় যেখানে ৫৮ নম্বর শ্লোক আছে: . অষ্টাদশ অধ্যায় (১৮/৫৮): এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, যারা আমাতে চিত্ত অর্পণ করে, তারা আমার প্রসাদে সমস্ত বাধা অতিক্রম করবে কিন্তু অহঙ্কারবশত আমার কথা না শুনলে তারা বিনাশ প্রাপ্ত হবে

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে ৫৯ নম্বর শ্লোক নেই ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে মাত্র ৫টি অধ্যায়ে (২য়, ৬ষ্ঠ, ৯ম, ১১শ এবং ১৮শ অধ্যায়) ৫৯ নম্বর বা তার বেশি শ্লোক রয়েছে

আপনি সম্ভবত দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫৯ নম্বর শ্লোকটির কথা বলছেন, যা আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্লোকটি হলো:

"বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ

রসবর্জং রসোঽপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে।।" ($2.59$)


শ্লোকটির সহজ ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রিয় সংযম এবং আসক্তি ত্যাগের এক গভীর রহস্য উন্মোচন করেছেন:

বাহ্যিক বর্জন: একজন মানুষ যদি জোর করে উপবাস করে বা ইন্দ্রিয়গুলোকে বিষয়বস্তু থেকে দূরে রাখে, তবে সাময়িকভাবে তার ইন্দ্রিয়গুলো শান্ত হয় কিন্তু সেই বিষয়ের প্রতি মনের ভেতর যে 'রস' বা আসক্তি (Desire) থাকে, তা দূর হয় না

আসল সমাধান: যখন কোনো সাধক পরমেশ্বর বা পরম সত্যের (পরং) সাক্ষাৎকার পান বা উচ্চতর আনন্দের স্বাদ পান, তখন তার নিচু স্তরের জাগতিক বিষয়ের প্রতি আসক্তি আপনাআপনিই চলে যায়

মূল শিক্ষা:

জোর করে কোনো কিছু ত্যাগ করার চেয়ে ভক্তি বা আধ্যাত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে মনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বেশি কার্যকর অর্থাৎ, "উন্নততর কোনো স্বাদ পেলে নিকৃষ্ট জিনিসের প্রতি আসক্তি এমনিতেই ঘুচে যায়"

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বিভিন্ন অধ্যায়ে ৬০ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবনদর্শন তুলে ধরে

. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ), শ্লোক ৬০

এই শ্লোকটি ইন্দ্রিয় সংবরণ বা আত্মসংযমের গুরুত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়

যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ

 ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসবং মনঃ।।

সরলার্থ: হে কৌন্তেয় (অর্জুন)! মোক্ষলাভের জন্য যত্নবান বিবেকী পুরুষের মনকেও এই চঞ্চল প্রমত্ত ইন্দ্রিয়সমূহ বলপূর্বক বিষয়বস্তুর দিকে আকর্ষণ করে বা হরণ করে নেয়

তাৎপর্য: এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সতর্ক করছেন যে, একজন জ্ঞানী ব্যক্তিও যদি সাবধান না থাকেন, তবে তার ইন্দ্রিয়গুলো এতটাই শক্তিশালী যে তা মনকে বিচলিত করে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে


. অষ্টাদশ অধ্যায় (মোক্ষযোগ), শ্লোক ৬০

এই শ্লোকটি মানুষের স্বভাব বা 'প্রকৃতি' এবং কর্মের বাধ্যবাধকতা নিয়ে কথা বলে

সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ত্যজেৎ

সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধুমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ।।

সরলার্থ: হে কুন্তিপুত্র! দোষযুক্ত হলেও নিজের স্বভাবজাত কর্ম ত্যাগ করা উচিত নয় কারণ, আগুনের সাথে যেমন ধোঁয়া থাকে, তেমনি সমস্ত কর্মই কোনো না কোনো দোষ দ্বারা আবৃত থাকে

তাৎপর্য: কোনো কাজই পূর্ণাঙ্গভাবে নিখুঁত নয় তাই নিজের নির্ধারিত কর্তব্য বা স্বধর্ম কঠিন বা ত্রুটিপূর্ণ মনে হলেও তা পালন করা উচিত

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে সব অধ্যায়ে ৬১ নম্বর শ্লোক নেই গীতার মাত্র কয়েকটি অধ্যায়ে ৬১ বা তার বেশি সংখ্যক শ্লোক রয়েছে তবে ১৮তম অধ্যায়ের (মোক্ষযোগ) ৬১ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত

এখানে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর ৬১ নম্বর শ্লোক নিয়ে আলোচনা করা হলো:

. ১৮তম অধ্যায় (মোক্ষযোগ), শ্লোক ৬১

এটিই সাধারণত ৬১ নম্বর শ্লোক বলতে সবথেকে বেশি উদ্ধৃত করা হয় এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন:

ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি

ভ্রাময়ন্সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।

সরলার্থ: হে অর্জুন! পরমেশ্বর সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থান করেন এবং সমস্ত জীবকে তাঁর মায়ার দ্বারা (শরীরেরূপ) যন্ত্রে আরোহণ করিয়ে চক্রের মতো ঘুরিয়ে দেন

তাৎপর্য: এখানে বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর আমাদের অন্তর্যামী আমাদের কর্মফল মায়া অনুযায়ী তিনি আমাদের জীবন পরিচালিত করেন


. ২য় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ), শ্লোক ৬১

এই শ্লোকে স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়ার উপায় বলা হয়েছে:

তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ

বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।

সরলার্থ: সাধক সেই সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত করে আমার (পরমেশ্বরের) প্রতি একাগ্র হয়ে অবস্থান করবেন যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ নিজের বশীভূত, তাঁর প্রজ্ঞা বা জ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত


. ১৮টি অধ্যায়ের শ্লোক সংখ্যার তালিকা

আপনার বোঝার সুবিধার্থে কোন কোন অধ্যায়ে ৬১ নম্বর শ্লোকটি পাওয়া সম্ভব তার একটি তালিকা দেওয়া হলো:

অধ্যায়

নাম

মোট শ্লোক সংখ্যা

৬১ নম্বর শ্লোক আছে কি?

১ম

অর্জুনবিষাদযোগ

৪৭

না

২য়

সাংখ্যযোগ

৭২

হ্যাঁ

৩য়

কর্মযোগ

৪৩

না

৬ষ্ঠ

আত্মসংযমযোগ

৪৭

না

১১শ

বিশ্বরূপদর্শনযোগ

৫৫

না

১৮শ

মোক্ষযোগ

৭৮

হ্যাঁ

(উল্লেখ্য: গীতার অধিকাংশ অধ্যায় ৪৭ বা তার কম শ্লোকে শেষ হয়েছে, তাই শুধুমাত্র ২য় এবং ১৮শ অধ্যায়েই মূলত ৬১ নম্বর শ্লোকটি পাওয়া যায়)

দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ৬২ নম্বর শ্লোকের কথা বলছেন, যা মানুষের পতন বা আসক্তির মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হিসেবে অত্যন্ত বিখ্যাত শ্লোকটি হলো:

ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে সঙ্গাৎ সঞ্জায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোহভিজায়তে।। ৬২।।

সরলার্থ:

বিষয়ের (ইন্দ্রিয়সুখের বস্তু) কথা চিন্তা করতে করতে মানুষের তাতে আসক্তি জন্মে আসক্তি থেকে সেই বস্তু পাওয়ার কামনা বা বাসনা তৈরি হয়, আর কামনা কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে সেখান থেকে ক্রোধের (রাগ) উৎপত্তি হয়


এই শ্লোকের মূল শিক্ষা:

শ্রীকৃষ্ণ এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি সাধারণ চিন্তা শেষ পর্যন্ত মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এর পরের শ্লোকেই (৬৩ নম্বর) বলা হয়েছে যে, ক্রোধ থেকে মোহ, মোহ থেকে স্মৃতিভ্রম, স্মৃতিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং অবশেষে মানুষের পূর্ণ পতন ঘটে

শ্লোকটি হলো:

ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদ্গুহ্যতরং ময়া বিমৃশ্যৈতদশেষেণ যথેચ્છসি তথা কুরু।। ১৮/৬৩

সরলার্থ:

"আমি তোমাকে এই গোপন থেকেও অতি গোপনীয় জ্ঞান দান করলাম এখন তুমি এই তত্ত্বটি সম্পূর্ণভাবে আলোচনা (বিবেচনা) করো এবং তারপর তোমার যা ইচ্ছা, তাই করো"


এই শ্লোকের তাৎপর্য:

মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা: এই শ্লোকটি প্রমাণ করে যে হিন্দুধর্মে বা গীতায় জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় না শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সব উপদেশ দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার অর্জুনের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন

বিমৃশ্য (বিচার-বিবেচনা): ভগবান বলছেন, অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ করো না আগে জ্ঞানটি নিয়ে বিচার করো, নিজের বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করো

যথેચ્છসি তথা কুরু: এটি গুরত্বপূর্ণ একটি মোড় ঈশ্বর মানুষকে পথ দেখাতে পারেন, কিন্তু সেই পথে চলা বা না চলার স্বাধীনতা মানুষের নিজের অর্থাৎ, কর্মের স্বাধীনতা এবং সেই কর্মফলের দায়বদ্ধতা উভয়ই মানুষের

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ২য় অধ্যায়ের ৬৪ নম্বর শ্লোকটি হলো:

রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি।। ৬৪।।

সরলার্থ:

যিনি রাগ (আসক্তি) এবং দ্বেষ (বিদ্বেষ) থেকে মুক্ত হয়েছেন এবং নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকে বশীভূত করেছেন, এমন জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি বিষয়সমূহের মধ্যে বিচরণ করেও চিত্তের প্রসন্নতা বা পরম শান্তি লাভ করেন


শ্লোকটির মূল শিক্ষা ব্যাখ্যা:

ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ মানুষ ইন্দ্রিয়ের বশবর্তী হয়ে বিষয়ের পেছনে ছোটে কিন্তু এখানে বলা হয়েছে, ইন্দ্রিয়গুলোকে ত্যাগের প্রয়োজন নেই, বরং সেগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন

আসক্তি বিদ্বেষ বর্জন: কোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত লোভ (রাগ) বা কোনো কিছুর প্রতি ঘৃণা (দ্বেষ)—এই দুই আবেগই মানুষের মনকে অশান্ত করে এই দুইয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আসে

চিত্ত প্রসন্নতা: যখন মন রাগ দ্বেষ থেকে মুক্ত হয়, তখন মানুষ এক গভীর আধ্যাত্মিক শান্তি বা 'প্রসাদ' লাভ করে এই প্রসন্নতা লাভ করলে জীবনের সমস্ত দুঃখের নিবৃত্তি ঘটে

অন্যান্য অধ্যায়ের তথ্য:

আপনার জানার সুবিধার্থে জানিয়ে রাখি, গীতার ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে মাত্র কয়েকটি অধ্যায়ে ৬৪ বা তার বেশি শ্লোক আছে:

দ্বিতীয় অধ্যায়: ৭২টি শ্লোক (এখানে ৬৪ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত বিখ্যাত)

অষ্টাদশ অধ্যায়: ৭৮টি শ্লোক

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১৮.৬৫

শ্লোক:

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োঽসি মে।।

bangla অনুবাদ: "তুমি আমাতে চিত্ত অর্পণ করো, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করো এবং আমাকে নমস্কার করো তাহলে তুমি আমাকেই প্রাপ্ত হবে তোমার কাছে আমার সত্য প্রতিজ্ঞা, যেহেতু তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়"


কেন এই শ্লোকটি বিশেষ?

ভক্তিযোগের নির্যাস: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে (এবং মানবজাতিকে) তাঁর কাছে পৌঁছানোর চারটি সহজ পথের কথা বলেছেন: মন দিয়ে স্মরণ করা, ভক্ত হওয়া, যজ্ঞ বা কর্ম অর্পণ করা এবং বিনয় বা প্রণাম জানানো

ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা: শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'সত্যং তে প্রতিজানে' বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, এই পথ অনুসরণ করলে ভক্ত অবশ্যই তাঁকে লাভ করবে

নিগূঢ় উপদেশ: একে গীতার 'মন্মনা' শ্লোক বলা হয়, যা নবম অধ্যায়ের ৩৪ নম্বর শ্লোকেও প্রায় একইভাবে বর্ণিত হয়েছে

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে ৬৬ নম্বর শ্লোক নেই (মোট ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে মাত্র ৭টি অধ্যায়ে ৬৬ বা তার বেশি শ্লোক আছে) তবে আপনি সম্ভবত গীতার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্তিম উপদেশের কথা বলছেন, যা অষ্টাদশ অধ্যায়ের (মোক্ষসন্ন্যাস যোগ) ৬৬ নম্বর শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে

এই শ্লোকটিকে গীতার 'চরম শ্লোক' বলা হয় শ্লোকটি হলো:

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।। (১৮.৬৬)


সহজ সরল অর্থ:

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন— "সমস্ত ধর্ম (অর্থাৎ জাগতিক কর্তব্য বা ফলের আশা) ত্যাগ করে একমাত্র আমারই শরণাপন্ন হও আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি দেব, তুমি শোক করো না"

শ্লোকটির মূল শিক্ষা:

সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ: এখানে 'ধর্ম ত্যাগ' মানে কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং আমিই কর্তাএই অহংকার এবং কর্মফলের চিন্তা ত্যাগ করে ঈশ্বরের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখাকে বোঝানো হয়েছে

নিশ্চয়তা: ভগবান নিজে দায়িত্ব নিচ্ছেন যে, যারা তাঁর শরণাগত হবে, তাদের কোনো পাপ বা অমঙ্গল স্পর্শ করবে না

অভয়দান: শ্লোকটির শেষে 'মা শুচঃ' কথাটির অর্থ হলো 'শোক করো না' এটি মানুষের মনের ভয় দুশ্চিন্তা দূর করার এক মহৌষধ

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১৮শ অধ্যায়, শ্লোক ৬৭

সংস্কৃত শ্লোক:

ইদং তে নাতপস্কায় নাভক্তায় কদাচন

চাশুশ্রূষবে বাচ্যং মাং যোহভ্যসূয়তি।।

বাংলা অনুবাদ:

"যিনি সংযমহীন (তপস্যাহীন), ভক্তিহীন, শ্রবণ করতে অনিচ্ছুক এবং যিনি আমার প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন, তাঁকে এই গোপনীয় উপদেশ (গীতার জ্ঞান) কখনও বলবে না"


এই শ্লোকের মূল বিষয়বস্তু:

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ৪টি গুণের কথা বলেছেন, যাদের কাছে এই জ্ঞান প্রকাশ করা উচিত নয়:

. তপস্যাহীন (অতপস্কায়): যারা ইন্দ্রিয় সংবরণ করতে পারে না বা কোনো আত্মসংযম নেই . ভক্তিহীন (নাভক্তায়): যাদের পরমেশ্বরের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা নেই . সেবা করতে অনিচ্ছুক (অশুশ্রূষবে): যারা গুরু বা ভগবানের সেবা করতে চায় না অথবা এই জ্ঞান শুনতে আগ্রহী নয় . অসূয়াপরায়ণ (যোহভ্যসূয়তি): যারা শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য শুনে ঈর্ষান্বিত হয় বা তাঁর দেবত্বে সন্দেহ পোষণ করে

সারসংক্ষেপ: গীতার এই অমূল্য জ্ঞান শুধুমাত্র শ্রদ্ধাবান এবং আগ্রহী ব্যক্তিদেরই প্রদান করা উচিত, যাতে এর অপব্যবহার না হয় এবং শ্রোতা প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারে

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (১৮.৬৮):

ইদং পরমং গুহ্যং মদ্ভক্তেম্বভিধাস্যতি ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মামেবৈষ্যত্যসংশয়ঃ।।

সরলার্থ:

"যিনি আমার ভক্তদের মধ্যে এই পরম গোপনীয় (গীতার জ্ঞান) উপদেশ দান করেন, তিনি আমার প্রতি পরাভক্তি লাভ করবেন এবং নিঃসন্দেহে আমাকেই প্রাপ্ত হবেন"


বিশ্লেষণ:

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ গীতার জ্ঞান প্রচারের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন:

পরম গুহ্যং: গীতার জ্ঞানকে ভগবান 'পরম গোপনীয়' বলে অভিহিত করেছেন, যা কেবল শুদ্ধ চিত্তের অধিকারীরাই উপলব্ধি করতে পারেন

প্রচারকের দায়িত্ব: যারা নিঃস্বার্থভাবে এই দিব্য জ্ঞান অন্যের কাছে (বিশেষ করে ভক্তদের মাঝে) পৌঁছে দেন, ভগবান তাদের ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন

প্রতিশ্রুতি: ভগবান এখানে নিশ্চিত করেছেন যে, এই সেবার মাধ্যমে মানুষ পরম ভক্তি লাভ করে এবং পরিশেষে তাঁর ধামেই ফিরে যায়

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে ৬৯টি শ্লোক নেই ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে কেবল দ্বিতীয় অধ্যায়ে (সাংখ্যযোগ) ৬৯ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শ্লোকটি হলো:

যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী

যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ।।


শ্লোকটির সহজ অর্থ:

সাধারণ মানুষের কাছে যা রাত (অর্থাৎ আধ্যাত্মিক জ্ঞান বা আত্মতত্ত্ব), সংযমী ব্যক্তি বা স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি সেই অবস্থায় জেগে থাকেন আবার সাধারণ মানুষ যে জাগতিক বিষয় ভোগ-বিলাসে মত্ত বা জেগে থাকে, তত্ত্বজ্ঞানী মুনির কাছে তা রাতের মতো অন্ধকার বা তুচ্ছ

মূল ভাবার্থ:

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে একজন আদর্শ মানুষের চেতনার পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন:

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি: সাধারণ মানুষ ইন্দ্রিয়সুখ, অর্থ এবং জাগতিক আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন থাকে তাদের কাছে আধ্যাত্মিকতা বা আত্মজ্ঞান হলো অস্পষ্ট বা ঘুমের মতো

সংযমী ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি: যিনি নিজের ইন্দ্রিয় জয় করেছেন, তিনি জানেন যে জাগতিক মায়া ক্ষণস্থায়ী তাই তিনি সেই আত্মিক প্রশান্তিতে জেগে থাকেন যা সাধারণের অগম্য

দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক ৭০

আপূর্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যদ্বৎ তদ্বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে শান্তিমাপ্নোতি কামকামী।।


সরলার্থ:

জলরাশি দ্বারা সর্বদা পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সমুদ্র যেমন অবিচলিত থাকে এবং চারিদিকের নদ-নদীর জলরাশি যেমন সমুদ্রে প্রবেশ করলেও তার কোনো বিকার ঘটায় না; ঠিক তেমনই স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির মনে সমস্ত ভোগবাসনা বা কামনাসমূহ প্রবেশ করলেও তিনি বিচলিত হন না কেবল এই প্রকার ব্যক্তিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন, বিষয়ভোগের কামনাকারী ব্যক্তি নয়

মূল শিক্ষা:

সমুদ্রের তুলনা: সমুদ্র যেমন বিশাল গভীর, স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষের মনও তেমনই গম্ভীর বাইরের জগতের হাজারো প্রলোভন তাঁকে অশান্ত করতে পারে না

শান্তির উৎস: শান্তি বাইরে থেকে আসে না; শান্তি আসে মনের নিয়ন্ত্রণ এবং অনাসক্তি থেকে

কামনা শান্তি: যে ব্যক্তি কামনার পেছনে ছোটে, সে কখনও তৃপ্ত হয় না কিন্তু যাঁর মন স্থির, তিনি সকল পরিস্থিতির মধ্যেও শান্ত থাকেন

দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৭১ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা প্রকৃত শান্তি লাভের উপায় বর্ণনা করে:

শ্লোক (সংস্কৃত):

বিহায় কামান্যঃ সর্বান্পুমাংশ্চরতি নিঃস্পৃহঃ নির্মমো নিরহঙ্কারঃ শান্তিমধিগচ্ছতি।। ৭১।।


বাংলা অনুবাদ:

"যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে নিঃস্পৃহ হয়ে বিচরণ করেন এবং যার কোনো মমতা অহঙ্কার নেই, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন"

শ্লোকের মূল শিক্ষা:

এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্থিতপ্রজ্ঞ বা স্থিতধী ব্যক্তির লক্ষণ শান্তি লাভের চারটি প্রধান শর্ত দিয়েছেন:

কামনা ত্যাগ (বিহায় কামান): মনের সমস্ত জাগতিক বাসনা বর্জন করা

নিঃস্পৃহতা (নিঃস্পৃহঃ): ইন্দ্রিয়সুখের প্রতি কোনো আসক্তি না রাখা

মমতাহীনতা (নির্মমো): 'আমার' বা 'মালিকানা' বোধ ত্যাগ করা

অহঙ্কারহীনতা (নিরহঙ্কারঃ): মিথ্যে অহঙ্কার বা দেহবোধ থেকে মুক্ত হওয়া

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক তবে একটি ছোট তথ্যগত সংশোধনী প্রয়োজন যা আপনার আলোচনাকে আরও নিখুঁত করতে সাহায্য করবে

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সব অধ্যায়ে ৭২ নম্বর শ্লোক নেই প্রকৃতপক্ষে, গীতার ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে শুধুমাত্র দ্বিতীয় অধ্যায়ে (সাংখ্যযোগ) ৭২ নম্বর শ্লোকটি পাওয়া যায় এটিই এই অধ্যায়ের সর্বশেষ শ্লোক

দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক ৭২:

শ্লোক:

এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি

স্থিত্বাস্যামন্তকালেঽপি ব্রহ্মনির্বাণমৃচ্ছতি।।

বাংলা অনুবাদ:

"হে পার্থ! এটিই হচ্ছে ব্রাহ্মী স্থিতি বা ভগবদ্ভাব এই অবস্থা প্রাপ্ত হলে মানুষ আর মোহাচ্ছন্ন হয় না অন্তিমকালেও (মৃত্যুর সময়) যদি কেউ এই অবস্থায় স্থিত থাকেন, তবে তিনি ভগবানের ধাম বা ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করেন"


কেন অন্য অধ্যায়ে ৭২ নম্বর শ্লোক নেই?

গীতার মোট ৭০০টি শ্লোকের বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অধিকাংশ অধ্যায়ের শ্লোক সংখ্যা ৭২-এর কম নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:

অধ্যায়

শ্লোক সংখ্যা

অধ্যায়

শ্লোক সংখ্যা

১ম অধ্যায়

৪৭

১০ম অধ্যায়

৪২

২য় অধ্যায়

৭২

১১শ অধ্যায়

৫৫

৩য় অধ্যায়

৪৩

১২শ অধ্যায়

২০

৪র্থ অধ্যায়

৪২

১৩শ অধ্যায়

৩৫

৫ম অধ্যায়

২৯

১৪শ অধ্যায়

২৭

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৪৭

১৫শ অধ্যায়

২০

৭ম অধ্যায়

৩০

১৬শ অধ্যায়

২৪

৮ম অধ্যায়

২৮

১৭শ অধ্যায়

২৮

৯ম অধ্যায়

৩৪

১৮শ অধ্যায়

৭৮

লক্ষ্য করুন: শুধুমাত্র দ্বিতীয় অধ্যায় (৭২টি শ্লোক) এবং অষ্টাদশ অধ্যায় (৭৮টি শ্লোক)- ৭২ নম্বর বা তার বেশি শ্লোক রয়েছে

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ১৮.৭৩

শ্লোক (সংস্কৃত):

অর্জুন উবাচ নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লব্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত

 স্থিতোঽস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।। ৭৩।।


বাংলা অনুবাদ:

অর্জুন বললেন: হে অচ্যুত! আপনার কৃপায় আমার মোহ দূর হয়েছে এবং আমি আত্মস্মৃতি ফিরে পেয়েছি এখন আমি সংশয়মুক্ত স্থির হয়েছি আমি আপনার আদেশ পালন করব (অর্থাৎ যুদ্ধ করব)


শ্লোকটির তাৎপর্য:

. মোহ মুক্তি: দীর্ঘ উপদেশের পর অর্জুন স্বীকার করছেন যে, অজ্ঞানতাজনিত যে বিভ্রান্তি তাঁকে আচ্ছন্ন করেছিল, তা দূর হয়েছে

. স্মৃতি লাভ: এখানে 'স্মৃতি' মানে কেবল মনে রাখা নয়, বরং নিজের প্রকৃত স্বরূপ এবং ভগবানের সাথে নিজের সম্পর্কের বোধ ফিরে পাওয়া

. সংশয় নিরসন: অর্জুনের মনে যে দ্বিধা ছিল (যুদ্ধ করবেন কি করবেন না), তা সম্পূর্ণ কেটে গেছে

. শরনাগতি: শ্লোকটির শেষ অংশ 'করিষ্যে বচনং তব' (আমি আপনার কথা পালন করব) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এটি ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে নিজের অহংকারের পূর্ণ সমর্পণের প্রতীক

আপনি বোধহয় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একটি বিশেষ বিষয়ের কথা বলছেন, তবে এখানে একটি ছোট তথ্যগত সংশোধন প্রয়োজন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১৮টি অধ্যায় রয়েছে এর মধ্যে শুধুমাত্র শেষ অধ্যায় অর্থাৎ অষ্টাদশ অধ্যায়ে (মোক্ষযোগ) ৭৪ নম্বর শ্লোকটি পাওয়া যায় অন্য কোনো অধ্যায়ে ৭৪টি শ্লোক নেই (অধিকাংশ অধ্যায় ২০ থেকে ৪৭টি শ্লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কেবল দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৭২টি শ্লোক আছে)

অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৭৪ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের কাছে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করছেন:

শ্লোক (১৮.৭৪):

সঞ্জয় উবাচ ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য মহাত্মনঃ

 সংবাদমিমমশ্রৌষমদ্ভুতং রোমহর্ষণম্।।


সহজ অর্থ:

সঞ্জয় বললেন— "এইভাবে আমি মহাত্মা বাসুদেব (শ্রীকৃষ্ণ) এবং মহাত্মা পার্থের (অর্জুন) সেই অদ্ভুত এবং রোমহর্ষণ (যা শরীরের লোম খাড়া করে দেয়) সংবাদ বা কথোপকথন শ্রবণ করলাম"

মূল প্রেক্ষাপট:

সঞ্জয়ের উপলব্ধি: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে সঞ্জয় দিব্যদৃষ্টির মাধ্যমে এই গীতার জ্ঞান শুনতে পেয়েছিলেন এই শ্লোকে তিনি তাঁর পরম সৌভাগ্যের কথা প্রকাশ করছেন

রোমহর্ষণ: ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত এই উপদেশ এবং অর্জুনের সাথে তাঁর এই দিব্য মিলন দেখে সঞ্জয় এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে তাঁর শরীরের লোম শিহরণে খাড়া হয়ে গিয়েছিল

উপসংহারের শুরু: এই শ্লোকটি থেকেই গীতার উপসংহারের শুরু হয়, যেখানে সঞ্জয় নিজের ভক্তি বিস্ময় প্রকাশ করেন

১৮তম অধ্যায়ের ৭৫ নম্বর শ্লোকটি হলো:

ব্যাসপ্রসাদাৎ শ্রুতবানেতদ্ গুহ্যমহং পরম্

যোগং যোগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ স্বয়ম্।।৭৫।।

সরলার্থ: (সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন) ব্যাসদেবের কৃপায় আমি এই পরম গোপনীয় যোগতত্ত্ব স্বয়ং যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে সরাসরি বলতে শুনেছি

তাৎপর্য:

এখানে সঞ্জয় স্বীকার করছেন যে, ঋষি বেদব্যাসের দেওয়া 'দিব্যদৃষ্টি' ফলেই তিনি কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এই কথোপকথন প্রাসাদে বসে শুনতে দেখতে পাচ্ছিলেন

এটি গীতার উপসংহারের দিকের একটি শ্লোক যেখানে এই জ্ঞানের অলৌকিক প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে

 @আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।


Post a Comment

0 Comments