শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-1-25 ( শ্লোক) শব্দার্থ (Word Meaning)

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-1-25 ( শ্লোক) শব্দার্থ 

(Word Meaning)


धृतराष्ट्र उवाच

धर्मक्षेत्रे कुरुक्षेत्रे समवेता युयुत्सवः।

मामकाः पाण्डवाश्चैव किमकुर्वत सञ्जय।।1.1।।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের (অর্জুনবিষাদযোগ) প্রথম শ্লোক এই শ্লোকটি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সূচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করে


মূল শ্লোক

ধৃতরাষ্ট্র উবাচ ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুয়ুৎসবঃ

 মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।। . ।।


শব্দার্থ (Word Meaning)

ধর্মক্ষেত্রে: পবিত্র ভূমিতে বা ধর্মের ক্ষেত্রে

কুরুক্ষেত্রে: কুরুক্ষেত্র নামক স্থানে

সমবেতাঃ: একত্রিত হয়েছে

যুয়ুৎসবঃ: যুদ্ধ করার ইচ্ছা নিয়ে

মামকাঃ: আমার পক্ষ (সন্তানরা)

পাণ্ডবাঃ: পাণ্ডুর পুত্রগণ (পাণ্ডবগণ)

: এবং

এব: নিশ্চয়ই

কিম্: কী

অকুর্বত: করেছে বা করেছিল

সঞ্জয়: ধৃতরাষ্ট্রের সারথি মন্ত্রী (যিনি দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন)


বাংলা ভাবার্থ

ধৃতরাষ্ট্র বললেন: "হে সঞ্জয়! ধর্মভূমি কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের অভিলাষে সমবেত হয়ে আমার পুত্রগণ এবং পাণ্ডুপুত্রেরা কী করল?"


সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

. সংশয় মোহ: অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র জানতেন যে কুরুক্ষেত্র একটি 'ধর্মক্ষেত্র' (পবিত্র স্থান) তাঁর মনে ভয় ছিল যে, এই পবিত্র স্থানের প্রভাবে তাঁর অধার্মিক পুত্রদের (কৌরবদের) মতিভ্রম হতে পারে অথবা পাণ্ডবদের পুণ্যফল বৃদ্ধি পেতে পারে . পার্থক্য সৃষ্টি: ধৃতরাষ্ট্র এখানে 'মামকাঃ' (আমার নিজের দল) এবং 'পাণ্ডবাঃ' (পাণ্ডবগণ) বলে বংশের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট করেছেন যদিও তাঁরা একই পরিবারের, তবুও পাণ্ডবদের তিনি নিজের বলে মনে করেননি . সঞ্জয়ের দিব্যদৃষ্টি: সঞ্জয় মহর্ষি বেদব্যাসের বরে দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলেন, যার ফলে তিনি প্রাসাদে বসেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা দেখতে শুনতে পাচ্ছিলেন

ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জয় পাণ্ডব কুরু সৈন্যদলের বর্ণনা দিতে শুরু করেন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের ২য় শ্লোকটি নিচে দেওয়া হলো:


মূল শ্লোক

সঞ্জয় উবাচ দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢং দুর্যোধনস্তদা আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ।। . ।।


শব্দার্থ (Word Meaning)

দৃষ্ট্বা: দেখে

তু: কিন্তু

পাণ্ডবানীকং: পাণ্ডবদের সৈন্যদলকে

ব্যূঢং: ব্যূহ আকারে সজ্জিত (Military Phalanx)

দুর্যোধনঃ: ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র

তদা: তখন

আচার্যম্: গুরু (দ্রোণাচার্য)

উপসঙ্গম্য: কাছে গিয়ে

রাজা: রাজা দুর্যোধন

বচনমব্রবীৎ: এই কথা বললেন


বাংলা ভাবার্থ

সঞ্জয় বললেন: "তখন রাজা দুর্যোধন পাণ্ডবদের ব্যূহবদ্ধ সৈন্যদল দেখে তাঁর আচার্য দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে এই কথা বললেন"


সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

. দুর্যোধনের মানসিকতা: পাণ্ডবদের সৈন্য সংখ্যা কৌরবদের চেয়ে কম থাকলেও তাদের শৃঙ্খলবদ্ধ সাজসজ্জা বা 'ব্যূহ' দেখে দুর্যোধন কিছুটা বিচলিত হয়েছিলেন . আচার্য দ্রোণাচার্য: দুর্যোধন সরাসরি যুদ্ধের সেনাপতি ভীষ্মের কাছে না গিয়ে প্রথমে তাঁর গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে গেলেন এর কারণ ছিল কূটনীতি; তিনি দ্রোণাচার্যকে পাণ্ডবদের শক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁকে যুদ্ধের জন্য আরও উদ্দীপ্ত করতে চেয়েছিলেন . রাজনীতি ভয়: যদিও ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে রাজা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, সঞ্জয় এখানে দুর্যোধনকে 'রাজা' বলে সম্বোধন করেছেন তাঁর দম্ভ অবস্থানের কারণে

হ্যাঁ, অবশ্যই! নম্বর শ্লোকে দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে পাণ্ডবদের সামরিক শক্তির প্রশংসা কৌশলের কথা উল্লেখ করছেন এটি অনেকটা দ্রোণাচার্যকে সতর্ক করার মতো ছিল


মূল শ্লোক (.)

পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম্ ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা।। ।।


শব্দার্থ (Word Meaning)

পশ্য: দেখো

এতাম্: এই

পাণ্ডুপুত্রাণাম্: পাণ্ডুপুত্রগণের

আচার্য: হে গুরু (দ্রোণাচার্য)

মহতীং: বিশাল

চমূম্: সৈন্যদল

ব্যূঢ়াম্: ব্যূহবদ্ধ বা সুসজ্জিত

দ্রুপদপুত্রেণ: দ্রুপদ রাজার পুত্র (ধৃষ্টদ্যুম্ন)

তব শিষ্যেণ: তোমার শিষ্য দ্বারা

ধীমতা: বুদ্ধিমান


বাংলা ভাবার্থ

দুর্যোধন বললেন: "হে আচার্য! আপনার বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদপুত্রের (ধৃষ্টদ্যুম্ন) দ্বারা ব্যূহাকারে সজ্জিত পাণ্ডুপুত্রদের এই বিশাল সৈন্যবাহিনী দেখুন"


সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা গূঢ় অর্থ

. কূটনীতি বিদ্রূপ: দুর্যোধন এখানে দ্রোণাচার্যকে কিছুটা খোঁচা দিচ্ছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন রাজা দ্রুপদের পুত্র এবং দ্রোণাচার্যেরই শিষ্য অথচ ধৃষ্টদ্যুম্ন জন্মেছিলেনই দ্রোণাচার্যকে বধ করার জন্য দুর্যোধন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, দ্রোণাচার্যের নিজের শিষ্যই আজ তাঁর বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী সাজিয়ে দাঁড়িয়েছে . ধীমতা (বুদ্ধিমান): দুর্যোধন ধৃষ্টদ্যুম্নকে 'বুদ্ধিমান' বলছেন কারণ তিনি দ্রোণাচার্যের কাছ থেকেই যুদ্ধবিদ্যা শিখে আজ তাঁর বিরুদ্ধেই চমৎকার ব্যূহ রচনা করেছেন . ভয় দম্ভ: এই শ্লোকে দুর্যোধনের মনের ভয় ফুটে ওঠে তিনি পাণ্ডবদের সৈন্যদলকে 'মহতীং' বা বিশাল বলে সম্বোধন করেছেন, যদিও কৌরবদের সৈন্যসংখ্যা পাণ্ডবদের চেয়ে বেশি ছিল

পাণ্ডব পক্ষের সেই মহারথীদের নাম জানা খুবই জরুরি, কারণ দুর্যোধন এই শ্লোকগুলোতে প্রতিপক্ষের শক্তির কথা উল্লেখ করে নিজের মনে ভয়ের কথা প্রকাশ করছেন

নিচে , নম্বর শ্লোকের একত্রিত সারাংশ এবং পাণ্ডব পক্ষের বীরদের তালিকা দেওয়া হলো:


মূল শ্লোক (., . .)

অত্র শূরা মহেষ্বাস ভীমার্জুনসমা যুধি যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ।। ।। ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান্ পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ।। ।। যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্ সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ।। ।।


বাংলা ভাবার্থ

দুর্যোধন বললেন: "এই পাণ্ডব সৈন্যদলে এমন অনেক বীর আছেন যারা ধনুর্বিদ্যায় ভীম অর্জুনের সমান যেমন—"

বীরদের তালিকা (যাঁদের নাম এই শ্লোকে আছে):

যুযুধান (সাত্যকি): শ্রীকৃষ্ণের শিষ্য যাদব বীর

বিরাট: মৎস্য দেশের রাজা (পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের আশ্রয়দাতা)

দ্রুপদ: পাঞ্চাল দেশের রাজা এবং দ্রৌপদীর পিতা

ধৃষ্টকেতু: চেদি দেশের রাজা

চেকিতান: যাদব বংশের এক পরাক্রমশালী বীর

কাশিরাজ: কাশী দেশের অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা

পুরুজিৎ কুন্তিভোজ: কুন্তীর দুই ভ্রাতা

শৈব্য: মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এক যোদ্ধা

যুধামন্যু উত্তমৌজা: পাঞ্চাল দেশের দুই অত্যন্ত সাহসী বীর

সৌভদ্র (অভিমন্যু): সুভদ্রা অর্জুনের মহাবীর পুত্র

দ্রৌপদেয়া (দ্রৌপদীর পুত্রগণ): দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র (প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্মা, শতানীক শ্রুতসেন)


সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

মহারথঃ: দুর্যোধন যাঁদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন 'মহারথী' একজন মহারথী হলেন তিনি, যিনি একাই দশ হাজার সাধারণ যোদ্ধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সক্ষম

ভীমার্জুনসমা: দুর্যোধন ভীম এবং অর্জুনকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কারণ কৌরবরা অর্জুনের গান্ডীব ধনুক এবং ভীমের গদার শক্তিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন

অবশ্যই! পাণ্ডবদের শক্তির বর্ণনা দেওয়ার পর, দুর্যোধন নিজের মনের ভয় ঢাকতে এবং নিজের সৈন্যদের উৎসাহিত করতে কৌরব পক্ষের প্রধান বীরদের নাম নিতে শুরু করেন

নিচে ., . এবং . নম্বর শ্লোকের সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:


মূল শ্লোক (., . .)

অস্মাকং তু বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে।। ।। ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব ।। ।। অন্যে বহবঃ শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ।। ।।


বাংলা ভাবার্থ

দুর্যোধন বললেন: "হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ (দ্রোণাচার্য)! আমাদের পক্ষেও যে সমস্ত প্রধান বীরগণ আছেন, আপনার অবগতির জন্য আমি তাঁদের নাম বলছি আমার সেনাবাহিনীর নায়করা হলেন—"

কৌরব পক্ষের প্রধান বীরদের তালিকা:

ভবান্ (স্বয়ং আপনি - দ্রোণাচার্য): কৌরব পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু

ভীষ্ম: কুরুবংশের পিতামহ এবং কৌরব সেনাপতি

কর্ণ: সূর্যপুত্র এবং দুর্যোধনের পরম মিত্র

কৃপ (কৃপাচার্য): কুরুবংশের কুলগুরু, যিনি যুদ্ধে অপরাজেয় (সমিতিঞ্জয়ঃ)

অশ্বত্থামা: দ্রোণাচার্যের পুত্র

বিকর্ণ: ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্রের মধ্যে একজন (যিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন)

সৌমদত্তি (ভুরিশ্রবা): সোমদত্তের পুত্র


সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা গূঢ় অর্থ

বিদ্রূপ কূটনীতি: দুর্যোধন প্রথমেই দ্রোণাচার্যকে 'দ্বিজোত্তম' (ব্রাহ্মণদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) বলে সম্বোধন করেছেন এটি যেমন সম্মানের, তেমনি একটি সূক্ষ্ম বিদ্রূপও বটেকারণ ব্রাহ্মণদের কাজ পূজা-অর্চনা করা, যুদ্ধ করা নয় দুর্যোধন বোঝাতে চেয়েছেন যে দ্রোণাচার্য যেন তাঁর শিষ্যদের প্রতি দয়া না দেখিয়ে বীরের মতো যুদ্ধ করেন

মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ: দুর্যোধন নম্বর শ্লোকে বলছেন যে, এই বীরেরা তাঁর জন্য প্রাণ ত্যাগ করতেও প্রস্তুত এটি একটি নেতিবাচক ভবিষ্যৎবাণীর মতো শোনায় (Irony), কারণ শেষ পর্যন্ত তাঁরা সকলেই যুদ্ধে প্রাণ হারান

যুদ্ধবিশারদাঃ: কৌরব পক্ষের এই যোদ্ধারা সকলেই বিভিন্ন অস্ত্র চালনায় এবং যুদ্ধকৌশলে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন

১০ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে দুর্যোধনের আত্মবিশ্বাস এবং একই সাথে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সংশয়দুটোই প্রকাশ পেয়েছে


মূল শ্লোক (.১০)

অপর্যাপ্তং তদশ্মাকং বলং ভীষ্মাভিবক্ষিতম্ পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিবক্ষিতম্।। ১০ ।।


বাংলা ভাবার্থ

দুর্যোধন বললেন: "পিতামহ ভীষ্ম দ্বারা রক্ষিত আমাদের এই সৈন্যবাহিনী অপরিমিত (অজেয়), কিন্তু ভীম দ্বারা রক্ষিত পাণ্ডবদের এই সৈন্যবাহিনী পরিমিত (সহজেই জয়যোগ্য)"


গূঢ় বিশ্লেষণ: দুর্যোধন কেন এমন মনে করেছিলেন?

. ভীষ্মের অপরাজেয় শক্তি: পিতামহ ভীষ্ম ছিলেন 'ইচ্ছামৃত্যু' বরের অধিকারী অর্থাৎ, তিনি নিজে না চাইলে কেউ তাঁকে মারতে পারত না দুর্যোধন মনে করেছিলেন, যতক্ষণ ভীষ্ম সেনাপতি হিসেবে সামনে আছেন, ততক্ষণ কৌরবদের হারানো অসম্ভব

. সংখ্যাগত আধিক্য: কৌরবদের ছিল ১১ অক্ষৌহিণী সৈন্য, আর পাণ্ডবদের ছিল মাত্র অক্ষৌহিণী এই বিশাল গাণিতিক ব্যবধান দুর্যোধনকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল

. ভীমের প্রতি তুচ্ছজ্ঞান: দুর্যোধন পাণ্ডবদের সেনাপতি হিসেবে অর্জুনের চেয়ে ভীমের নাম নিতে পছন্দ করতেন কারণ ভীম ছিলেন তাঁর চিরশত্রু তিনি মনে করতেন, ভীম কেবল গায়ের জোরে লড়েন, কিন্তু ভীষ্মের মতো রণকৌশল বা দিব্য অস্ত্র তাঁর নেই

. শব্দের দ্ব্যর্থবোধক অর্থ (The Irony): আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শ্লোকে ব্যবহৃত 'অপর্যাপ্তম্' (Aparyaptam) শব্দটির দুটি অর্থ হয়:

একদিকে এর অর্থ— 'অসীম' বা বিশাল (দুর্যোধন এই অর্থেই বলেছিলেন)

অন্যদিকে এর অর্থ— 'অপ্রতুল' বা অপর্যাপ্ত পরবর্তীকালে দেখা যায়, কৌরব সৈন্য বিশাল হওয়া সত্ত্বেও ধর্ম শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের পক্ষে থাকায় কৌরব বাহিনীই আসলে 'অপ্রতুল' প্রমাণিত হয়েছিল

১১ নম্বর শ্লোকে দুর্যোধন এক বিশেষ রণকৌশলের কথা বলছেন তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, সবাইকে মিলে পিতামহ ভীষ্মকে রক্ষা করতে হবে


মূল শ্লোক (.১১)

অয়নেষু সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ ভীষ্মমেবাভিবক্ষন্তু ভবন্তঃ সর্ব এব হি।। ১১ ।।


বাংলা ভাবার্থ

দুর্যোধন বললেন: "অতএব, আপনারা সকলে নিজ নিজ ব্যূহ-বিভাগে (সৈন্যদলের নির্দিষ্ট স্থানে) স্থিত থেকে সবদিক দিয়ে কেবল পিতামহ ভীষ্মকেই রক্ষা করুন"


কেন তিনি ভীষ্মের সুরক্ষার ওপর এত জোর দিয়েছিলেন?

. জয়ের প্রধান চাবিকাঠি: দুর্যোধন জানতেন যে ভীষ্ম হলেন কৌরব পক্ষের প্রধান স্তম্ভ যতক্ষণ ভীষ্ম জীবিত রণক্ষেত্রে সক্রিয় থাকবেন, পাণ্ডবদের পক্ষে জয়লাভ করা অসম্ভব তাই তাঁকে রক্ষা করাই ছিল দুর্যোধনের প্রধান অগ্রাধিকার

. ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা: ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি পাণ্ডবদের বধ করবেন না, কিন্তু প্রতিদিন হাজার হাজার পাণ্ডব সৈন্য নিধন করবেন এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পাণ্ডবরা নিশ্চয়ই ভীষ্মকে আক্রমণ করবে, এটি দুর্যোধন আঁচ করতে পেরেছিলেন

. শিখণ্ডীর ভয়: দুর্যোধন জানতেন যে ভীষ্ম কোনো নারীর বিরুদ্ধে বা যিনি পূর্বে নারী ছিলেন (শিখণ্ডী) তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না পাণ্ডবরা যদি শিখণ্ডীকে সামনে রেখে ভীষ্মকে আক্রমণ করে, তবে পিতামহ অস্ত্র ত্যাগ করবেন তাই দুর্যোধন অন্য বীরদের নির্দেশ দেন যেন তাঁরা ভীষ্মকে চারিদিক থেকে ঘিরে রাখেন যাতে শিখণ্ডী তাঁর কাছে পৌঁছাতে না পারেন

. সেনাপতির মনোবল: যদি প্রধান সেনাপতি নিরাপদ থাকেন, তবে পুরো সেনাবাহিনীর মনোবল তুঙ্গে থাকে ভীষ্মের মতো অভিজ্ঞ যোদ্ধার পতন মানেই কৌরবদের নিশ্চিত পরাজয়

মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শুরুতে (গীতার প্রথম অধ্যায়ের ১২ নম্বর শ্লোকে) পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের মনের বিষাদ ভয় দূর করার জন্য যে শব্দটি করেছিলেন, সেটি ছিল তাঁর শঙ্খধ্বনি

শ্লোকটি হলো:

তস্য সঞ্জানয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্

সেই শব্দটি কী ছিল?

ভীষ্মদেব প্রথমে সিংহের মতো গর্জন (সিংহনাদ) করেছিলেন এবং তারপরেই অত্যন্ত উচ্চস্বরে তাঁর শঙ্খ বাজিয়েছিলেন এই সম্মিলিত আওয়াজই ছিল সেই প্রচণ্ড শব্দ

এই শব্দের প্রভাব কী হয়েছিল?

ভীষ্মের এই শঙ্খধ্বনির প্রভাব ছিল বহুমুখী:

দুর্যোধনের মনে আনন্দ সঞ্চার: পাণ্ডবদের সৈন্যব্যূহ দেখে দুর্যোধন কিছুটা ভীত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন পিতামহ ভীষ্মের এই শক্তিশালী গর্জন শঙ্খধ্বনি তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল এবং তাঁর মনে যুদ্ধের উৎসাহ আনন্দ ফিরিয়ে দিয়েছিল

যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা: ভীষ্মের এই শঙ্খধ্বনিই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয় এর পরপরই কৌরব পক্ষের অন্যান্য বীররা তাঁদের শঙ্খ, ভেরী ঢাক বাজাতে শুরু করেন

ভীষণ আওয়াজ: গীতায় বলা হয়েছে যে, এই সম্মিলিত শব্দ আকাশ পৃথিবী প্রকম্পিত করেছিল যদিও পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের শঙ্খধ্বনি কৌরবদের হৃদয়ে বেশি ভীতি সৃষ্টি করেছিল, তবে ভীষ্মের শঙ্খধ্বনি ছিল কৌরব শিবিরের আত্মবিশ্বাস রক্ষার প্রথম পদক্ষেপ

একটি মজার বিষয়: ভীষ্ম শঙ্খ বাজিয়ে দুর্যোধনকে আনন্দ দিলেও, এটি পরোক্ষভাবে তাঁর মৃত্যুর আহ্বান এবং কৌরব বংশের ধ্বংসের বার্তাও বহন করছিলযা দুর্যোধন সেই মুহূর্তে বুঝতে পারেননি

শ্লোকটি হলো:

দেহিনোঽস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র মুহ্যতি।। ১৩।।

শ্লোকের সহজ অর্থ:

যেমন এই দেহের মধ্যে দেহধারী আত্মার কুমার অবস্থা, যৌবন এবং বার্ধক্য পর্যায়ক্রমে আসে, তেমনি মৃত্যুর পর আত্মা এক দেহ থেকে অন্য দেহ প্রাপ্ত হয় স্থিতপ্রজ্ঞ বা ধীর ব্যক্তিরা এই পরিবর্তনে বিভ্রান্ত হন না


মূল শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:

পরিবর্তনশীল দেহ বনাম অপরিবর্তনীয় আত্মা: আমাদের শরীর শৈশব থেকে কৈশোর, তারপর যৌবন এবং সবশেষে বার্ধক্যে উপনীত হয় শরীর প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে, কিন্তু আমরা অনুভব করি যে "আমি" সেই একই ব্যক্তি আছি এই "আমি"- হলো আত্মা

মৃত্যু আসলে কী? শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে, বার্ধক্য থেকে মৃত্যুতে যাওয়া ঠিক তেমনই একটি সাধারণ পরিবর্তন যেমনটি ছিল শৈশব থেকে যৌবনে যাওয়া এটি কেবল একটি "দেহান্তর" বা পোশাক বদলানোর মতো

মোহমুক্তি: যারা জ্ঞানী বা 'ধীর', তারা জানেন যে আত্মা অবিনাশী তাই প্রিয়জনের মৃত্যুতে তারা সাধারণ মানুষের মতো শোকাতুর বা বিভ্রান্ত হন না

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ১৪ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সুখ-দুঃখের অনিত্যতা এবং ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন

শ্লোকটি হলো:

মাত্রা স্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ আগমাপায়িনোহনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত।।

শ্লোকের সরলার্থ:

হে কুন্তীপুত্র! ইন্দ্রিয় বিষয়ের সংযোগের ফলেই শীত-উষ্ণ এবং সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয় এগুলি আসলে অনিত্য, অর্থাৎ আসে এবং আবার চলেও যায় হে ভারত! তুমি এই পরিবর্তনশীল অনুভূতিগুলোকে ধৈর্য সহকারে সহ্য করার চেষ্টা করো


মূল শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:

ইন্দ্রিয় বিষয়ের সংযোগ: আমাদের চোখ, কান, নাক, জিভ এবং ত্বক যখন বাইরের জগতের সংস্পর্শে আসে, তখনই আমরা ভালো বা মন্দের বোধ করি

দ্বন্দ্বের সমন্বয়: শীত যেমন গ্রীষ্মের বিপরীত, সুখও তেমনি দুঃখের বিপরীত একটি থাকলে অন্যটি আসবেইএটি প্রকৃতির নিয়ম

অনিত্যতা: কোনো পরিস্থিতি বা আবেগই স্থায়ী নয় এগুলো মেঘের মতো আসে এবং চলে যায়

তিতিক্ষা (সহনশীলতা): শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দিচ্ছেন যেন তিনি এই অস্থায়ী সুখে অতি আনন্দিত বা দুঃখে অতি ভেঙে না পড়েন এই সহনশীলতাই হলো মানসিক শান্তির প্রথম ধাপ

১৪ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে ধৈর্য বা 'তিতিক্ষা' শিক্ষা দিয়েছেন, ১৫ নম্বর শ্লোকে তার ফল বা চরম লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে

এই শ্লোকটি (.১৫) আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানেই প্রথম 'অমৃতত্ব' বা মোক্ষলাভের যোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে

শ্লোক ১৫:

যং হি ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ সমদুঃখসুখং ধীরং সোঽমৃতত্বায় কল্পতে।।


সরলার্থ:

"হে পুরুষশ্রেষ্ঠ (অর্জুন)! সুখ দুঃখে যিনি বিচলিত হন না এবং উভয় অবস্থাতেই যিনি সমভাবাপন্ন (স্থির) থাকেন, সেই ধীর ব্যক্তিই অমৃতত্ব বা মুক্তি লাভের উপযুক্ত হন"


আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ:

. সমত্ব (Equanimity): আগের শ্লোকে বলা হয়েছিল যে সুখ-দুঃখ আসবেই এই শ্লোকে কৃষ্ণ বলছেন, প্রকৃত 'ধীর' ব্যক্তি তিনি, যিনি এই দ্বন্দ্বগুলোর দ্বারা ব্যথিত হন না অর্থাৎ, প্রিয় কিছু প্রাপ্তিতে তিনি যেমন অহংকারে ফেটে পড়েন না, তেমনি অপ্রিয় কিছুতে ভেঙে পড়েন না

. 'ধীর' ব্যক্তির সংজ্ঞা: এখানে 'ধীর' বলতে কেবল শান্ত মানুষকে বোঝানো হয়নি; বরং এমন একজনকে বোঝানো হয়েছে যার বুদ্ধি আত্মতত্ত্বে স্থির তিনি জানেন যে দেহ ইন্দ্রিয় নশ্বর, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর এই বিবেকবুদ্ধিই তাকে স্থৈর্য দান করে

. অমৃতত্ব বা মোক্ষ: সংসারে প্রতিটি মানুষই জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ কৃষ্ণ বলছেন, যখন একজন মানুষ মানসিকভাবে শীত-উষ্ণ বা সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন, তখনই তিনি মায়ার বন্ধন ছিন্ন করার যোগ্যতা অর্জন করেন এই অবস্থাই হলো অমৃতত্ব

. পুরুষর্ষভ সম্বোধনের তাৎপর্য: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'পুরুষর্ষভ' (পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা ঋষভ সদৃশ) বলে সম্বোধন করেছেন এর মাধ্যমে তিনি অর্জুনকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সাধারণ মানুষের মতো ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত হওয়া তার সাজে না; তার উচিত বীরের মতো নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা


ব্যাবহারিক জীবনে এর প্রয়োগ: আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও যখন কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি আসে, তখন এই 'তিতিক্ষা' (সহ্য করা) এবং 'সমত্ব' (স্থির থাকা) অভ্যাস করলে মানসিক চাপ কমে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে

১৫ নম্বর শ্লোক (সংস্কৃত বাংলা):

সর্বস্য চাহং হৃদি সংনিবিষ্টো মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তক্বদ্বেদবিদেব চাহম্।। ১৫।।


সরল অর্থ:

সর্বব্যাপী অবস্থান: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, "আমিই সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত"

স্মৃতি জ্ঞানের উৎস: জীবের স্মৃতি, জ্ঞান এবং বিস্মৃতি (ভুলে যাওয়া)—সবই তাঁর থেকেই আসে

বেদের লক্ষ্য: সমস্ত বেদের মাধ্যমে কেবল তাঁকেই (পরমাত্মাকে) জানার চেষ্টা করা হয়েছে

বেদের রচয়িতা জ্ঞাতা: তিনিই বেদান্তের সংকলক এবং তিনিই বেদের প্রকৃত অর্থ জানেন


কেন এই শ্লোকটি গুরুত্বপূর্ণ?

. ব্যক্তিগত সংযোগ: এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঈশ্বর দূরে কোথাও নন, বরং আমাদের অন্তরেই 'পরমাত্মা' রূপে আছেন . মানসিক ক্ষমতা: আমাদের শেখার ক্ষমতা বা মনে রাখার ক্ষমতা যে আসলে একটি দৈব দান, তা এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে . আধ্যাত্মিক সারমর্ম: শাস্ত্র পড়ার মূল উদ্দেশ্য যে তথ্য সংগ্রহ নয় বরং ঈশ্বরকে অনুভব করা, শ্রীকৃষ্ণ এখানে সেটাই বুঝিয়েছেন

আপনি সম্ভবত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কোনো একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়ের ১৬ নম্বর শ্লোকের কথা বলছেন যেহেতু আপনি অধ্যায়টি উল্লেখ করেননি, তাই সাধারণত মানুষ যে অধ্যায়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করে, তার প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিখ্যাত ১৬ নম্বর শ্লোক নিচে দেওয়া হলো:

. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ)

এই শ্লোকটি দর্শনের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ উভয়োরপি দৃষ্টোহন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ।। ১৬।।

সরলার্থ: যা অসৎ (অনিত্য দেহাদি) তার কোনো অস্তিত্ব নেই, আর যা সৎ (নিত্য আত্মা) তার কোনো বিনাশ নেই তত্ত্বদর্শীগণ এই উভয়েরই পার্থক্য বা সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করেছেন

সারকথা: এখানে শরীর এবং আত্মার পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে আত্মা চিরন্তন, কিন্তু শরীর নশ্বর


. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ষষ্ঠ অধ্যায় (ধ্যানযোগ)

যাঁরা যোগাভ্যাস বা সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে চান, তাঁদের জন্য এটি জরুরি:

নাত্যন্তস্তস্তু যোগোঽস্তি চৈকান্তমনশতঃ চাতিস্বপ্নশীলস্য জাগ্রতো নৈব চার্জুন।। ১৬।।

সরলার্থ: হে অর্জুন! যিনি খুব বেশি আহার করেন অথবা যিনি একেবারেই আহার করেন না, আবার যিনি খুব বেশি ঘুমান অথবা যিনি সবসময় জেগে থাকেনতাঁর পক্ষে যোগাভ্যাস করা সম্ভব নয়

সারকথা: জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বা পরিমিতিবোধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে


. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: দশম অধ্যায় (বিভূতিযোগ)

এখানে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে অনুরোধ করছেন:

বক্তুমর্হস্যশেষেন দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ যাভিবিভূতিভির্লোকানিমাংস্ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।। ১৬।।

সরলার্থ: অর্জুন বলছেন, "আপনার সেই সমস্ত দিব্য বিভূতির কথা আমাকে বিস্তারিত বলুন, যে বিভূতিসমূহের দ্বারা আপনি এই সমস্ত জগতকে ব্যাপ্ত করে আছেন"

১৭ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এখানে পরমাত্মার স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে

শ্লোকটি হলো:

অবিভক্তঞ্চ ভূতেষু বিভক্তমিব স্থিতম্ ভূতভর্তৃ তজ্জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু ।। ১৭।।

সরলার্থ:

তিনি (পরমাত্মা) সমস্ত প্রাণীর মধ্যে অবিভক্তভাবে বর্তমান থাকলেও যেন বিভক্তের মতো অবস্থিত বলে মনে হয় তাঁকে সমস্ত ভূতের (প্রাণীর) পালনকর্তা, সংহারকর্তা এবং সৃষ্টিকর্তা বলে জানতে হবে


শ্লোকটির মূল শিক্ষা:

অখণ্ডতা একত্ব: পরমাত্মা সব মানুষের মধ্যে থাকলেও তিনি আলাদা আলাদা নন যেমন আকাশ একটিই, কিন্তু আলাদা আলাদা পাত্রের ভেতরে থাকলে তাকে আলাদা মনে হয়, ঠিক তেমনি পরমাত্মা এক হয়েও প্রতিটি জীবের হৃদয়ে ভিন্নভাবে প্রকাশিত হন

তিনটি বিশেষ গুণ: এই শ্লোকে ঈশ্বরকে তিনটি প্রধান ভূমিকায় দেখানো হয়েছে:

পালনকর্তা (ভূতভর্তৃ): তিনি সকল জীবকে ধারণ পোষণ করেন

সংহারকর্তা (গ্রসিষ্ণু): প্রলয়কালে তিনিই সব কিছু নিজের মধ্যে বিলীন করে নেন

সৃষ্টিকর্তা (প্রভবিষ্ণু): সৃষ্টির শুরুতে তিনিই সব কিছুর উদ্ভব ঘটান

সহজ কথায়, ঈশ্বরকে এখানে অসীম জ্যোতি এবং সমস্ত শক্তির উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যা আমাদের ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও আসলে তা এক এবং অদ্বিতীয়

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ (১৮) নম্বর শ্লোক বিভিন্ন অধ্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব প্রকাশ করে তবে আপনি যদি অত্যন্ত জনপ্রিয় দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ) বা চতুর্থ অধ্যায় (জ্ঞানযোগ)-এর কথা বুঝিয়ে থাকেন, তবে তার অর্থ নিচে দেওয়া হলো:

. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ), শ্লোক ১৮

অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ অনাশিনোঽপ্রমেয়স্য তস্মাদ্ যুধ্যস্ব ভারত।।

সরলার্থ: অবিনাশী, অপরিমেয় এবং নিত্য আত্মার এই দেহগুলি বিনাশশীল বলে কথিত হয়েছে অতএব হে ভারত (অর্জুন), তুমি যুদ্ধ করো

মর্মার্থ: এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, শরীর নশ্বর কিন্তু আত্মা অমর তাই শোক ত্যাগ করে স্বধর্ম পালন করা উচিত


. চতুর্থ অধ্যায় (জ্ঞানযোগ), শ্লোক ১৮

কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মণি কর্ম যঃ বুদ্ধিমান্মনুষ্যেষু যুক্তঃ কৃৎস্নকর্মকৃৎ।।

সরলার্থ: যিনি কর্মের মধ্যে অকর্ম (নিষ্কাম ভাব) দেখেন এবং অকর্মের মধ্যে কর্ম দেখেন, তিনিই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান তিনিই যোগী এবং তিনিই সমস্ত কর্ম সম্পাদনকারী

মর্মার্থ: এটি কর্মযোগের একটি গূঢ় তত্ত্ব ফলের আশা না করে কর্ম করলে তা কর্ম হয়েও 'অকর্ম' (বন্ধনহীন), আর অলসভাবে বসে থেকেও মনে মনে কামনা করলে তা আসলে 'কর্ম' (বন্ধনযুক্ত)


. পঞ্চদশ অধ্যায় (পুরুষোত্তম যোগ), শ্লোক ১৮

যস্মাৎ ক্ষরমতীতোঽহমক্ষরাদপি চোত্তমঃ অতোঽস্মি লোকে বেদে প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ।।

সরলার্থ: যেহেতু আমি ক্ষর (বিনাশশীল জগত) অপেক্ষা অতীত এবং অক্ষর (জীবাত্মা) অপেক্ষাও উত্তম, তাই জগতে বেদে আমি 'পুরুষোত্তম' নামে প্রসিদ্ধ

১৯ নম্বর শ্লোক

শ্লোকটি হলো:

জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্ নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ভূয়ঃ

 অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।

শ্লোকের সহজ অর্থ:

এই শ্লোকটির মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার অমরত্ব ব্যাখ্যা করেছেন এর মূল কথাগুলো হলো:

জন্ম মৃত্যুহীন: আত্মার কখনো জন্ম হয় না এবং মৃত্যুও হয় না

অপরিবর্তনীয়: এটি এমন নয় যে অতীতে ছিল না, এখন আছে বা ভবিষ্যতে থাকবে না আত্মা সবসময় বিদ্যমান

শাশ্বত: আত্মা জন্মরহিত, নিত্য, স্থায়ী এবং পুরাতন হয়েও চিরনবীন

অবিনশ্বর: শরীর নষ্ট হয়ে গেলেও বা কেউ শরীরকে হত্যা করলেও আত্মাকে হত্যা করা সম্ভব নয়


কেন এই শ্লোকটি গুরুত্বপূর্ণ?

অর্জুন যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে স্বজনদের হারানোর ভয়ে বিষাদগ্রস্ত ছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মৃত্যু কেবল শরীরের হয়, আত্মার নয় এটি শোক কাটিয়ে কর্তব্যে মনোনিবেশ করার একটি দার্শনিক ভিত্তি

নোট: আপনি যদি অন্য কোনো অধ্যায়ের বা অন্য কোনো গ্রন্থের (যেমন: চণ্ডী বা উপনিষদ) ১৯ নম্বর শ্লোক সম্পর্কে জানতে চান, তবে দয়া করে সেটি উল্লেখ করুন আমি বিস্তারিত জানিয়ে দেব

২০ নম্বর শ্লোক

জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্- নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ভূয়ঃ

অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো- হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।

শ্লোকের মূল বিষয়বস্তু:

এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আত্মার অমরত্ব ব্যাখ্যা করেছেন এর মূল কথাগুলো হলো:

জন্ম-মৃত্যুহীন: আত্মার কখনো জন্ম হয় না এবং কখনো মৃত্যুও হয় না

অপরিবর্তনীয়: আত্মা এমন নয় যে অতীতে ছিল না, বর্তমানে আছে বা ভবিষ্যতে থাকবে না এটি জন্মহীন, নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাতন হয়েও চিরনতুন

অবিনশ্বর: শরীর ধ্বংস হলেও আত্মা কখনো বিনাশপ্রাপ্ত হয় না

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: প্রথম অধ্যায়, শ্লোক ২১

অর্জুন উবাচ সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেঽচ্যুত ২১

সরলার্থ: অর্জুন বললেনহে অচ্যুত (শ্রীকৃষ্ণ), দয়া করে আমার রথটিকে উভয় পক্ষের সৈন্যদলের মাঝখানে স্থাপন করুন


এই শ্লোকটির গুরুত্ব:

অর্জুনের বীরত্ব: যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে অর্জুন দেখতে চেয়েছিলেন তার বিপক্ষে কারা যুদ্ধ করতে এসেছেন তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন

শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকা: ভগবান হয়েও কৃষ্ণ এখানে অর্জুনের সারথি (রথচালক) হিসেবে তাঁর ভক্তের আদেশ পালন করছেন এটি ভক্ত ভগবানের মধ্যকার মধুর সম্পর্কের প্রতিফলন

সন্ধিক্ষণ: এই শ্লোক থেকেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত শুরু হয়, যেখানে অর্জুন সবাইকে দেখে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন এবং পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণ তাকে গীতার উপদেশ দেবেন

২২ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার অমরত্ব এবং দেহ পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে একটি সুন্দর উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন

শ্লোকটি হলো:

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহাতি নরোহপরাণি তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা- ন্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।।


সরল অর্থ:

মানুষ যেমন জীর্ণ বা পুরোনো বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহী বা আত্মা ঠিক তেমনই পুরাতন জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর গ্রহণ করে

মূল শিক্ষা:

মৃত্যু মানে শেষ নয়: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, মৃত্যু আসলে পোশাক পরিবর্তনের মতো একটি সাধারণ ঘটনা মাত্র

আত্মার নিত্যতা: শরীর নশ্বর এবং পরিবর্তনশীল, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর আত্মা কখনো বৃদ্ধ হয় না বা ধ্বংস হয় না

শোকের অনর্থকতা: যেহেতু আত্মা এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হয় মাত্র, তাই প্রিয়জনের মৃত্যুতে অত্যধিক শোক করা অনুচিত

এই শ্লোকটি মূলত পুনর্জন্মের ধারণাকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করে আমাদের জীবনের নশ্বরতা আত্মার অবিনশ্বরতার সত্যকে সামনে আনে

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ২৩ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এখানে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার অমরত্ব এবং অবিনাশী হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন

শ্লোকটি হলো:

নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো শোষয়তি মারুতঃ।।

সরলার্থ:

নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি: অস্ত্রসমূহ এই আত্মাকে ছেদন করতে পারে না

নৈনং দহতি পাবকঃ: অগ্নি একে দগ্ধ করতে পারে না

চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো: জল একে ভেজাতে পারে না

শোষয়তি মারুতঃ: বায়ু একে শুষ্ক করতে পারে না


মূল তাৎপর্য:

এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, আত্মা হলো অবিনশ্বর জড় জগতের কোনো প্রাকৃতিক শক্তি বা মানুষের তৈরি কোনো মারণাস্ত্র আত্মার কোনো ক্ষতি করতে পারে না

. অক্ষয় অব্যয়: শরীরের বিনাশ হলেও আত্মার বিনাশ হয় না মৃত্যু কেবল একটি শরীর থেকে অন্য শরীরে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া মাত্র . প্রকৃতির প্রভাবমুক্ত: আমাদের শরীর মাটি, জল, আগুন, বাতাস আকাশ দিয়ে তৈরিতাই এই পঞ্চভূত দ্বারা শরীর প্রভাবিত হয় কিন্তু আত্মা এই সবের ঊর্ধ্বে, তাই আগুন তাকে পোড়াতে পারে না বা জল তাকে গলাতে পারে না

অর্জুন যখন শোকাতুর হয়ে অস্ত্র ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, তখন ভগবান তাকে এই পরম সত্যটি মনে করিয়ে দিয়ে উৎসাহিত করেছিলেন যেযাদের তিনি মারার ভয় পাচ্ছেন, তাদের আত্মাকে হত্যা করা কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাঙ্খ্যযোগ) ২৪ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার অবিনশ্বরতা এবং তার চিরন্তন প্রকৃতির কথা আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন

শ্লোকটি হলো:

অচ্ছেদ্যোঽয়মদাহ্যোঽয়মক্লেদ্যোঽশোষ্য এব নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোঽয়ং সনাতনঃ।। ২৪।।

শ্লোকের সহজ অর্থ:

এই আত্মাকে ছেদন করা যায় না, একে দগ্ধ করা যায় না, একে ভেজানো যায় না এবং একে শুকানোও যায় না আত্মা নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অচল এবং সনাতন (অনাদি)


এই শ্লোক থেকে প্রাপ্ত মূল শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:

প্রকৃতিগত গুণ: আগের শ্লোকে (২৩ নম্বর) বলা হয়েছিল যে অস্ত্র বা আগুন আত্মাকে নষ্ট করতে পারে না ২৪ নম্বর শ্লোকে ভগবান জোর দিয়ে বলছেন যে, আত্মা অচ্ছেদ্য (যা কাটা যায় না) এবং অদাহ্য (যা পোড়ানো যায় না)

সর্বব্যাপী স্থির: আত্মাকে বলা হয়েছে 'সর্বগতঃ' এর অর্থ হলো আত্মা সব জায়গায় বিদ্যমান এটি 'স্থাণু' বা স্থির এবং 'অচল', অর্থাৎ এর কোনো পরিবর্তন বা বিচ্যুতি নেই

সনাতন সত্তা: আত্মা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি হয়নি; এটি 'সনাতন' অর্থাৎ এর শুরুও নেই, শেষও নেই

কেন এই বর্ণনা?

অর্জুন যখন আত্মীয়-স্বজনদের হারানোর ভয়ে শোকাতুর ছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে বোঝাচ্ছিলেন যেমৃত্যু কেবল দেহের হয়, আত্মার নয় আমরা যাকে বিনাশ মনে করি, তা আসলে কেবল একটি বাহ্যিক পরিবর্তন মাত্র আত্মা তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যে সবসময় একই রকম থাকে

আপনি সম্ভবত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায়ের ২৫ নম্বর শ্লোকের কথা বলছেন যেহেতু আপনি অধ্যায়টি উল্লেখ করেননি, তাই সাধারণত মানুষ যে অধ্যায়গুলো বেশি পড়ে, তার মধ্যে ২৫ নম্বর শ্লোকে যা বলা হয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো:

. দ্বিতীয় অধ্যায় (সাংখ্যযোগ)

এই অধ্যায়ের ২৫ নম্বর শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এখানে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন:

অব্যক্তোঽয়মচিন্ত্যোঽয়মবিকার্যোঽয়মুচ্যতে তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি।।

সরলার্থ: এই আত্মা অব্যক্ত (ইন্দ্রিয়ের অগম্য), অচিন্ত্য (চিন্তার অতীত) এবং অবিকার্য (পরিবর্তনহীন) অতএব, আত্মার এই প্রকৃত স্বরূপ জেনে তোমার শোক করা উচিত নয়

তাৎপর্য: অর্জুন যখন স্বজনদের মৃত্যুর ভয়ে শোকাতুর ছিলেন, তখন কৃষ্ণ তাকে বোঝাচ্ছিলেন যে শরীর ধ্বংস হলেও আত্মার বিনাশ নেই


. চতুর্থ অধ্যায় (জ্ঞানযোগ)

এখানে বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞের কথা বলা হয়েছে:

বিষয়: এই শ্লোকে বলা হয়েছে যে, কোনো কোনো যোগী দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করেন, আবার কেউ কেউ ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে নিজেকে আহুতি দিয়ে জ্ঞানযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন


. ষষ্ঠ অধ্যায় (ধ্যানযোগ)

এখানে মনের স্থিরতা নিয়ে বলা হয়েছে:

বিষয়: ধৈর্যসহকারে বুদ্ধির দ্বারা মনকে ধীরে ধীরে স্থির করতে হবে এবং আত্মাতে মনকে নিবিষ্ট করে অন্য কোনো চিন্তা করা চলবে না

 আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐পাঁশকুড়া।।


 

Post a Comment

0 Comments