রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভা : গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য : পরিত্রাণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য নিদর্শন হলো তাঁর গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য। বাংলা সাহিত্যে ও মঞ্চাভিনয়ে তিনি এই ধারার সার্থক রূপকার। আপনার উল্লেখ করা 'পরিত্রাণ' নাটকটি রবীন্দ্র-নাট্যসাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিচে রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য এবং বিশেষ করে 'পরিত্রাণ' নাটকটি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো:
১. গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যের প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম জীবনে 'বাল্মীকি-প্রতিভা' বা 'কালমৃগয়া'-র মতো গীতিনাট্য (Opera) রচনা করেছিলেন, যেখানে গানই ছিল নাট্যবয়ানার প্রধান মাধ্যম। পরবর্তীকালে তিনি সুরের সাথে তালের চলন এবং অঙ্গভঙ্গির সমন্বয় ঘটিয়ে তৈরি করেন নৃত্যনাট্য (Dance Drama)। তাঁর উল্লেখযোগ্য তিনটি নৃত্যনাট্য হলো— চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা এবং শ্যামা।
২. 'পরিত্রাণ' নাটকের পরিচয়
'পরিত্রাণ' মূলত রবীন্দ্রনাথের একটি নাট্য-রূপান্তর। এটি তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস 'বউ-ঠাকুরানীর হাট'-এর কাহিনি অবলম্বনে রচিত। নাট্যকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ একই গল্পকে বিভিন্ন সময় ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন:
- বউ-ঠাকুরানীর হাট (১৮৮৩): মূল উপন্যাস।
- প্রায়শ্চিত্ত (১৯০৯): উপন্যাসের প্রথম নাট্যরূপ।
- পরিত্রাণ (১৯২৯): 'প্রায়শ্চিত্ত' নাটকেরই আরও সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত রূপ।
৩. বিষয়বস্তু ও চরিত্র
'পরিত্রাণ' নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতাপাদিত্য এবং তাঁর পুত্র উদয়াদিত্য ও কন্যা বিভার জীবনসংগ্রাম। তবে এই নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র হলো ধনঞ্জয় বৈরাগী।
- ধনঞ্জয় বৈরাগী: এই চরিত্রটি রবীন্দ্রনাথের দর্শনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধের প্রতীক। পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধীর 'সত্যাগ্রহ' আন্দোলনের ছায়া অনেকেই এই চরিত্রের মধ্যে খুঁজে পান।
- সংঘাত: নাটকে একদিকে প্রতাপাদিত্যের কঠোর রাজশক্তি ও দম্ভ, অন্যদিকে উদয়াদিত্য ও ধনঞ্জয় বৈরাগীর প্রেম ও আত্মত্যাগের সংঘাত ফুটে উঠেছে।
৪. 'পরিত্রাণ'-এর বৈশিষ্ট্য
- গানের প্রভাব: এটি সরাসরি নৃত্যনাট্য না হলেও এতে গানের ব্যবহার অত্যন্ত সংকেতধর্মী। বিশেষ করে ধনঞ্জয় বৈরাগীর কণ্ঠে গানগুলি নাটকের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়।
- অহিংসার জয়: নাটকটির নাম 'পরিত্রাণ' হওয়ার সার্থকতা এখানেই যে, এটি কেবল বাহ্যিক মুক্তি নয়, বরং অন্তরের সংকীর্ণতা ও অহংকার থেকে মুক্তির পথ দেখায়।
- সহজিকরণ: 'প্রায়শ্চিত্ত' নাটকের জটিলতা কমিয়ে 'পরিত্রাণ'-এ রবীন্দ্রনাথ নাটকটিকে আরও গতিশীল ও মঞ্চসফল করে তুলেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের এই সৃষ্টিগুলো প্রমাণ করে যে তিনি কেবল সাহিত্যিক ছিলেন না, বরং মঞ্চের প্রতিটি স্পন্দন বুঝতেন। 'পরিত্রাণ' নাটকটি আজও তার মানবিক আবেদন ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে প্রাসঙ্গিক।
· ধনঞ্জয় বৈরাগীর গান: যেমন— "আমারে যে বাঁধবে ধরে সেই বাঁধন কি আছে রে" বা "ওরে শিকল তোরে করলেম বিকল"। এই গানগুলোতে কীভাবে ভয়কে জয় করা এবং রাজশক্তিকে তুচ্ছ করার তেজ ফুটে উঠেছে, তা আমরা দেখতে পারি।
· বিভা ও উদয়াদিত্য: এই ভাই-বোনের আত্মত্যাগ এবং তাঁদের মধ্যকার করুণ অথচ দৃঢ় সম্পর্কের দৃশ্যগুলো।
· প্রতাপাদিত্যের দম্ভ বনাম ধনঞ্জয়ের অহিংসা: নাটকের সেই নির্দিষ্ট দৃশ্য যেখানে প্রতাপাদিত্য ধনঞ্জয়কে বন্দি করতে চান, কিন্তু ধনঞ্জয় তাঁর আত্মিক শক্তিতে মুক্ত থাকেন।
এই নাটকের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গানের গূঢ় অর্থ এবং চরিত্রের দ্বন্দ্ব নিয়ে একটু গভীরে প্রবেশ করি:
১. ধনঞ্জয় বৈরাগীর গানের গূঢ় অর্থ
নাটকের একটি বিশেষ গান হলো:
"আমারে যে বাঁধবে ধরে সেই বাঁধন কি আছে রে— আমি যে তোর আপন হাতের বাঁধন কাটব রে॥"
ব্যাখ্যা: এই গানটি কেবল সুর নয়, এটি একটি চরম রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ঘোষণা। রাজা প্রতাপাদিত্য যখন ধনঞ্জয়কে কারারুদ্ধ করতে চান, তখন ধনঞ্জয় এই গানটি গেয়ে বুঝিয়ে দেন যে, বাইরের লোহার শিকল দিয়ে ভেতরের মুক্ত আত্মাকে বেঁধে রাখা অসম্ভব।
- অহিংসার তেজ: এখানে 'বাঁধন কাটা' মানে বিদ্রোহ নয়, বরং মনের ভয় দূর করা। ধনঞ্জয় বলছেন, রাজার দণ্ডভয় তখনই কার্যকর হয় যখন প্রজারা ভয় পায়। ভয় কেটে গেলে রাজার শক্তি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
২. নির্দিষ্ট চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব: উদয়াদিত্য
'পরিত্রাণ' নাটকে উদয়াদিত্য চরিত্রটি এক গভীর বিষাদ ও কর্তব্যের দ্বন্দ্বে দুলতে থাকে।
- পিতা বনাম আদর্শ: উদয়াদিত্য একজন সংবেদনশীল মানুষ। তিনি জানেন তাঁর পিতা প্রতাপাদিত্য অত্যাচারী, কিন্তু পিতাকে অমান্য করা তাঁর জন্য যন্ত্রণাদায়ক।
- প্রজাপ্রীতি বনাম রাজধর্ম: পিতার আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি যখন প্রজাদের পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি একাধারে বিদ্রোহী এবং একাধারে ট্র্যাজিক নায়ক। তাঁর মানসিক দ্বন্দ্বটি হলো— তিনি শান্তি চান, কিন্তু পরিবেশ তাঁকে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড় করিয়ে দেয়।
৩. প্রতাপাদিত্য: ক্ষমতার দম্ভ বনাম পরাজয়
প্রতাপাদিত্য চরিত্রটি একরোখা শক্তির প্রতীক। তাঁর দ্বন্দ্বটি সরাসরি নয়, বরং সূক্ষ্ম। তিনি দেখেন তাঁর তলোয়ারের ধার ধনঞ্জয়ের হাসির কাছে হেরে যাচ্ছে। একজন রাজা যখন দেখেন তাঁর প্রজারা মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছে না, তখন তাঁর ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ হতে শুরু করে— এটিই তাঁর চরিত্রের অভ্যন্তরীণ পরাজয়।
ধনঞ্জয় বৈরাগী চরিত্রটি কেবল গান্ধীর ভাবনার পূর্বসূরি নয়, বরং এটি রবীন্দ্র-দর্শনের সেই শাশ্বত সত্য যা গান্ধীজির রাজনৈতিক আন্দোলনের অনেক আগেই সাহিত্যে মূর্ত হয়েছিল।
নিচে এই তুলনামূলক আলোচনা এবং বিভা-উদয়াদিত্যর ট্র্যাজেডি নিয়ে কিছু আলোকপাত করা হলো:
১. ধনঞ্জয় বৈরাগী ও গান্ধীর 'সত্যাগ্রহ'
রবীন্দ্রনাথ ১৯০৯ সালে 'প্রায়শ্চিত্ত' লিখেছিলেন, যখন মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করছেন মাত্র। অথচ ধনঞ্জয় বৈরাগীর চরিত্রে আমরা এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখি যা হুবহু সত্যাগ্রহের মূলমন্ত্র:
- ভয়হীনতা (Fearlessness): ধনঞ্জয় প্রজাদের বলতেন, "রাজার দণ্ড তখনি সত্য হয় যখন প্রজা ভয় পায়।" এটিই ছিল গান্ধীর মূল কথা—ভয়মুক্ত সমাজ গঠন।
- কর না দেওয়া
(Tax Resistance): নাটকে ধনঞ্জয় প্রজাদের খাজনা দিতে নিষেধ করছেন, কিন্তু তা চুরির উদ্দেশ্যে নয়, বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসেবে। এটি সরাসরি গান্ধীর 'ডাণ্ডি মার্চ' বা 'চৌরিচৌরা'র অহিংস অসহযোগের প্রতিফলন।
- শত্রুর প্রতি প্রেম: ধনঞ্জয় প্রতাপাদিত্যকে ঘৃণা করেন না, বরং তাঁর অন্তরের পরিবর্তন চান। গান্ধীর দর্শনেও ছিল—পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।
একটি মজার তথ্য: অনেক সমালোচক মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে ভবিষ্যতে ভারতের মুক্তির পথ হবে এই অহিংসা, যা পরে গান্ধীর মাধ্যমে বাস্তবে রূপ পায়।
২. বিভা ও উদয়াদিত্য: রাজপ্রাসাদের বিষণ্ণ ট্র্যাজেডি
অন্যদিকে, বিভা ও উদয়াদিত্যর সম্পর্কটি অত্যন্ত করুণ। এটি কেবল একটি পারিবারিক বিবাদ নয়, বরং ব্যক্তিগত ভালোবাসা বনাম রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার লড়াই।
- উদয়াদিত্যর বিসর্জন: উদয়াদিত্য রাজপুত্র হয়েও রাজসুখ ত্যাগ করেছেন। তিনি পিতার অন্যায় সহ্য করতে না পেরে প্রজাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ট্র্যাজেডি হলো—তিনি না পারলেন আদর্শ বিসর্জন দিতে, না পারলেন পিতার ভালোবাসা পেতে।
- বিভার নিঃশব্দ বেদনা: বিভা এই নাটকের সবচেয়ে শান্ত অথচ শক্তিশালী চরিত্র। একদিকে তাঁর স্বামী (চন্দ্রদ্বীপের রাজা) এবং অন্যদিকে তাঁর পিতা ও ভাই—এই ত্রিমুখী সংকটে বিভার যে আত্মত্যাগ, তা রবীন্দ্র-সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি। সে ঘর এবং বাহির—উভয় দিক থেকেই রিক্ত হয়েছে।
৩. শেষ পরিণতির সার্থকতা
'পরিত্রাণ' নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই নাটকের মূল সুর। উদয়াদিত্য ও বিভা জাগতিকভাবে হয়তো হেরে গেছেন বা সর্বস্ব হারিয়েছেন, কিন্তু নৈতিকভাবে তাঁরা মুক্তি বা 'পরিত্রাণ' পেয়েছেন। আর ধনঞ্জয় বৈরাগী সেই মুক্তির পথপ্রদর্শক।
0 Comments