মহাভারতের বনপর্ব : ঋষিদের বর্ণিত বিখ্যাত উপাখ্যান : রাজা শিবি ও কপোত কাহিনী: শরণাগতকে রক্ষা করতে নিজের দেহ উৎসর্গের কাহিনী
মহাভারতের বনপর্বে পাণ্ডবদের বনবাসকালে মহর্ষি লোমশ যুধিষ্ঠিরকে অনেক পবিত্র ও নীতিমূলক কাহিনী শুনিয়েছিলেন। তার মধ্যে উশীনর-পুত্র রাজা শিবি ও কপোতের (কবুতর) কাহিনীটি আত্মত্যাগ এবং শরণাগত ধর্মের এক চরম নিদর্শন।
এখানে সেই বিখ্যাত কাহিনীটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
পরীক্ষার প্রেক্ষাপট
রাজা শিবি তাঁর দানশীলতা ও সত্যনিষ্ঠার জন্য ত্রিলোকে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর এই গুণের পরীক্ষা নিতে দেবরাজ ইন্দ্র এক বাজপাখির রূপ ধরেন এবং ধর্মরাজ যম একটি কপোতের রূপ ধারণ করেন।
শরণাগত কপোত ও রাজার ধর্ম
একদিন রাজা শিবি এক যজ্ঞে বসেছিলেন, এমন সময় একটি ভীত-সন্ত্রস্ত কপোত উড়ে এসে তাঁর কোলে আশ্রয় নেয়। কপোতটি প্রাণভয়ে কাঁপছিল কারণ একটি শিকারি বাজপাখি তাকে তাড়া করছিল।
বাজপাখির যুক্তি: বাজপাখিটি রাজার কাছে এসে মানুষের ভাষায় দাবি জানায় যে, কপোতটি তার খাদ্য। সে বলে, "মহারাজ, আপনি ধর্মের রক্ষক হয়ে আমার মুখ থেকে আহার কেড়ে নিচ্ছেন কেন? আমি ক্ষুধার্থ, এই শিকার না পেলে আমি মারা যাব।"
রাজার সংকল্প: রাজা শিবি উত্তর দেন, "এই কপোতটি আমার শরণাগত। কোনো অবস্থাতেই আমি একে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না। শরণাগতকে রক্ষা করা ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম।"
আত্মত্যাগের চরম পরীক্ষা
বাজপাখি তখন রাজাকে প্রস্তাব দেয় যে, যদি তিনি কপোতটিকে না ছাড়েন, তবে তাকে ওই কপোতের ওজনের সমান রাজার নিজের শরীরের মাংস কেটে দিতে হবে। রাজা শিবি সানন্দে রাজি হলেন।
রাজা একটি পাল্লা আনালেন। একদিকে রাখা হলো কপোতটি, অন্যদিকে রাজা নিজের উরু থেকে মাংস কেটে পাল্লায় রাখতে লাগলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাজা যত মাংসই রাখছিলেন, কপোতের পাল্লাটি ততই ভারী হতে থাকল।
শেষ পর্যন্ত কোনো মাংসেই যখন ওজন সমান হলো না, তখন রাজা শিবি নিজেই পাল্লায় উঠে বসলেন। তিনি কপোতের প্রাণের বিনিময়ে নিজের পুরো শরীর উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হলেন।
দেবতাদের বরদান
রাজার এই অসামান্য ত্যাগ দেখে ইন্দ্র ও যম তাঁদের প্রকৃত রূপ ধারণ করলেন। তাঁরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে জানালেন যে, এটি ছিল কেবল একটি পরীক্ষা।
"হে রাজন, আপনার কীর্তি যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন অক্ষয় হয়ে থাকবে।"
দেবতারা আশীর্বাদ করলেন যে রাজার ক্ষতবিক্ষত দেহ আগের মতো সুন্দর হয়ে যাবে এবং তিনি অক্ষয় পুণ্য লাভ করবেন।
শিক্ষণীয় বিষয়:
এই উপাখ্যানটি আমাদের শেখায় যে, শরণাগতকে রক্ষা করা জীবনের চেয়েও বড় ধর্ম। মহাভারতের এই অধ্যায়টি মূলত ত্যাগের মহিমা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকার প্রেরণা দেয়।
@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

0 Comments