মহাভারতের উদ্যোগপর্ব: মূল কাহিনীসংক্ষেপ

 


মহাভারতের উদ্যোগপর্ব: মূল কাহিনীসংক্ষেপ

মহাভারতের উদ্যোগপর্ব: মূল কাহিনীসংক্ষেপ

·         শ্রীকৃষ্ণের শান্তিপ্রস্তাব ও পান্ডবদের পাঁচটি গ্রাম দাবি: যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে শ্রীকৃষ্ণ শান্তি দূত হিসেবে হস্তিনাপুরে যান এবং পাণ্ডবদের জন্য মাত্র পাঁচটি গ্রাম দাবি করেন।

·         দুর্যোধনের অনমনীয়তা: দুর্যোধন "বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী" বলে শ্রীকৃষ্ণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাঁকে বন্দী করার ধৃষ্টতা দেখান।

·         সৈন্য সমাবেশ ও মিত্র সংগ্রহ: কুরু ও পাণ্ডব উভয় পক্ষই বিভিন্ন রাজ্যের রাজা ও বীরদের নিজেদের পক্ষে টানতে শুরু করে।

·         বিশ্বরূপ দর্শন: কুরুসভায় শ্রীকৃষ্ণ তাঁর দিব্য রূপ প্রদর্শন করে নিজের ঈশ্বরত্ব এবং আসন্ন বিনাশের সংকেত দেন।

·         কর্ণ ও কুন্তী সংবাদ: মা কুন্তী কর্ণের জন্মপরিচয় প্রকাশ করে তাঁকে পাণ্ডব পক্ষে যোগ দিতে বলেন, কিন্তু বন্ধুত্বের খাতিরে কর্ণ দুর্যোধনের পাশেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

·         বলরাম ও বিদুরের অবস্থান: যুদ্ধের নিশ্চিত জেনে বলরাম তীর্থযাত্রায় যান এবং মহাত্মা বিদুর নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেন।

v শ্রীকৃষ্ণের শান্তিপ্রস্তাব ও পান্ডবদের পাঁচটি গ্রাম দাবি

শ্রীকৃষ্ণের শান্তিপ্রস্তাব এবং পান্ডবদের পাঁচটি গ্রাম দাবি সম্পর্কে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে:

শ্রীকৃষ্ণের শান্তিপ্রস্তাব এবং পান্ডবদের পাঁচটি গ্রাম দাবি:

·         পান্ডবদের দাবি: পান্ডবরা অত্যন্ত বিনয়ী এবং ন্যায্য উপায়ে ইন্দ্রপ্রস্থ সহ তাঁদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে চেয়েছিলেন।

·         শ্রীকৃষ্ণের প্রস্তাব: শ্রীকৃষ্ণ, যিনি পান্ডবদের হয়ে শান্তিদূত হিসেবে কুরু সভায় যোগ দিয়েছিলেন, তিনি এই দাবিটি কুরুরাজের সামনে স্থাপন করেন।

·         দাবিটি হলো: পান্ডবরা অন্তত পাঁচটি গ্রামের জন্য অনুরোধ করেছিলেন—ইন্দ্রপ্রস্থ, বৃকস্থল, মাকন্দ, বারণাবত এবং অবন্তী (বা কোনো পাঁচটি গ্রাম)। তাঁরা জানিয়েছিলেন যে এই পাঁচটি গ্রাম পেলেও তাঁরা সন্তুষ্ট থাকবেন।

·         দুর্যোধনের প্রতিক্রিয়া: দুর্যোধন, যিনি সব কিছু অধিকার করতে চেয়েছিলেন, তিনি এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত অবজ্ঞা এবং ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন।

·         দুর্যোধনের প্রতিজ্ঞা: দুর্যোধন কুরু সভায় ঘোষণা করেন যে, সুচ দিয়েও মাপা যাবে এমন কোনো মাটি তিনি পান্ডবদের বিনা যুদ্ধে দেবেন না। এই সিদ্ধান্তের ফলে যুদ্ধের অনিবার্যতা আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

v দুর্যোধনের অনমনীয়তা এবং শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করার দুঃসাহস

কুরুসভার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি মহাভারতের উদ্যোগপর্বের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অংশ। দুর্যোধনের অনমনীয়তা এবং শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করার ধৃষ্টতা যুদ্ধের পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছিল। নিচে এর মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো:


দুর্যোধনের অনমনীয়তা ও দম্ভ

·         শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: শ্রীকৃষ্ণ যখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পাণ্ডবদের জন্য মাত্র পাঁচটি গ্রাম দাবি করেন, তখন দুর্যোধন তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

·         বিখ্যাত উক্তি: দুর্যোধন দম্ভভরে ঘোষণা করেন—

"বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী।"

অর্থাৎ, যুদ্ধ ছাড়া তিনি পাণ্ডবদের সূঁচের অগ্রভাগে যতটুকু মাটি ধরে, ততটুকুও দেবেন না।

·         উপদেশ অবজ্ঞা: ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ এবং বিদুরের মতো গুরুজনরা শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ করলেও দুর্যোধন কারো কথাই কানে তোলেননি।

শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করার দুঃসাহস

·         ষড়যন্ত্র: দুর্যোধন ও তাঁর সঙ্গী শকুনি, দুঃশাসন ও কর্ণ মিলে পরিকল্পনা করেন যে, শ্রীকৃষ্ণকে বন্দী করলেই পাণ্ডবরা অসহায় হয়ে পড়বে এবং যুদ্ধ ছাড়াই কৌরবদের জয় নিশ্চিত হবে।

·         ধৃষ্টতা: একজন রাজদূতকে বন্দী করা তৎকালীন রাজধর্মের চরম বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও, অহংকারে অন্ধ দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণকে শৃঙ্খলিত করার আদেশ দেন।

·         বিদুরের সতর্কবাণী: বিদুর দুর্যোধনকে সতর্ক করেছিলেন যে, শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ কোনো দূত নন, তাঁকে বন্দী করা অসম্ভব এবং আত্মঘাতী।

শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন

·         ভয়হীন অবস্থান: দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে শ্রীকৃষ্ণ বিচলিত না হয়ে উচ্চস্বরে হাসেন।

·         বিশ্বরূপ প্রদর্শন: তিনি কুরুসভায় তাঁর বিশ্বরূপ (Divinity) প্রদর্শন করেন। তাঁর শরীর থেকে অজস্র দেব-দেবী এবং তেজ নির্গত হতে থাকে। সভায় উপস্থিত সকলেই সেই উজ্জ্বল আলোয় চোখ বন্ধ করে ফেলেন, কেবল ভীষ্ম, দ্রোণ এবং বিদুর সেই দিব্য রূপ দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন।

·         বার্তা: এই ঘটনার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ প্রমাণ করেন যে, তাঁকে বন্দী করা কারোর সাধ্য নয় এবং কুরু বংশের ধ্বংস এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

v কুরু ও পাণ্ডব উভয় পক্ষের সৈন্য সমাবেশ ও মিত্র সংগ্রহ

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কুরু ও পাণ্ডব উভয় পক্ষই আর্যাবর্তের বিভিন্ন শক্তিশালী রাজ্য ও বীরদের নিজেদের দলে টানার জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। এই সৈন্য সমাবেশ ও মিত্র সংগ্রহের মূল বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:


কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষের শক্তিমত্তা

যুদ্ধের প্রস্তুতি শেষে দুই পক্ষের মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৮ অক্ষৌহিণী।

·         কৌরব পক্ষ: ১১ অক্ষৌহিণী সৈন্য।

·         পাণ্ডব পক্ষ: ৭ অক্ষৌহিণী সৈন্য।

অক্ষৌহিণী কী? এক অক্ষৌহিণী সৈন্যদলে ২১,৮৭০টি রথ, ২১,৮৭০টি হাতি, ৬৫,৬১০টি ঘোড়া এবং ১,০৯,৩৫০ জন পদাতিক সৈন্য থাকে।


প্রধান মিত্র ও রাজ্যসমূহ

পক্ষ

প্রধান মিত্র ও রাজ্য

প্রধান সেনাপতি/বীর

কৌরব

মদ্র (শল্য), প্রাগজ্যোতিষ (ভগদত্ত), সিন্ধু (জয়দ্রথ), অবন্তী, গান্ধার, কাম্বোজ এবং ত্রিগর্ভ।

ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও শল্য।

পাণ্ডব

পাঞ্চাল (দ্রুপদ), মৎস্য (বিরাট), মগধ, চেদি, কাশী এবং যাদবদের একাংশ (সাত্যকি)।

ধৃষ্টদ্যুম্ন (প্রধান সেনাপতি), অর্জুন, ভীম, সাত্যকি ও শিখণ্ডী।


গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা

·         শ্রীকৃষ্ণের নারায়ণী সেনা: অর্জুন ও দুর্যোধন দুজনেই সাহায্যের জন্য দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের কাছে যান। শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে নিরস্ত্র অবস্থায় এক পক্ষে এবং তাঁর বিশাল নারায়ণী সেনা অন্য পক্ষে রাখার প্রস্তাব দেন। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বেছে নেন, আর দুর্যোধন খুশি মনে নারায়ণী সেনা গ্রহণ করেন।

·         মদ্ররাজ শল্যের কৌশল: শল্য ছিলেন নকুল-সহদেবের মামা এবং পাণ্ডবদের সাহায্য করতে আসছিলেন। কিন্তু পথে দুর্যোধন চাতুর্য করে তাঁকে আপ্যায়িত করেন। আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে শল্য না জেনে দুর্যোধনকে বর দিয়ে ফেলেন এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও কৌরব পক্ষে যোগ দিতে বাধ্য হন।

·         বিরাটের সমর্থন: অজ্ঞাতবাসের সময় পাণ্ডবরা বিরাট রাজ্যে ছিলেন। সেই সুবাদে মৎস্যরাজ বিরাট তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়ে পাণ্ডবদের পাশে দাঁড়ান।

·         দ্রুপদের ভূমিকা: দ্রৌপদীর পিতা এবং পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ পাণ্ডবদের প্রধান স্তম্ভ ছিলেন। তাঁর পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নই পাণ্ডব বাহিনীর প্রধান সেনাপতি মনোনীত হন।


নিরপেক্ষ পক্ষ

এই মহাযুদ্ধে প্রায় সব রাজ্য অংশ নিলেও দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তি নিরপেক্ষ ছিলেন:

1.     বলরাম: তিনি কৃষ্ণ ও দুর্যোধন—উভয়কেই স্নেহ করতেন এবং আত্মীয়দের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখতে চাননি। তাই তিনি তীর্থযাত্রায় চলে যান।

2.     বিদুর: ধৃতরাষ্ট্রের পরামর্শদাতা হওয়া সত্ত্বেও অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি অস্ত্র ধারণ করেননি এবং নিরপেক্ষ থাকেন।

v কর্ণ ও কুন্তীর সংবাদ এবং কর্ণের পাণ্ডব পক্ষে যোগদানে অস্বীকার

মহাভারতের উদ্যোগপর্বে কর্ণ ও কুন্তীর সংবাদ অধ্যায়টি অত্যন্ত আবেগঘন এবং গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের প্রাক্কালে কুন্তী যখন বুঝতে পারেন যে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র কর্ণ এবং অন্য পাঁচ পুত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অনিবার্য, তখন তিনি কর্ণের জন্মপরিচয় প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন।

নিচে এই ঘটনার মূল পর্যায়গুলো তুলে ধরা হলো:


১. গঙ্গার তীরে সাক্ষাৎ

কর্ণ যখন গঙ্গার তীরে মধ্যাহ্নকালীন সূর্য উপাসনা করছিলেন, তখন কুন্তী সেখানে উপস্থিত হন। কর্ণের উপাসনা শেষ হলে কুন্তী নিজেকে তাঁর জননী হিসেবে পরিচয় দেন এবং কর্ণের জন্মের প্রকৃত ইতিহাস (দুর্বাসা মুনির মন্ত্র ও সূর্যদেবের আশীর্বাদ) খুলে বলেন।

২. কুন্তীর প্রস্তাব ও পাণ্ডবদের পক্ষে আহ্বান

কুন্তী কর্ণকে অনুরোধ করেন যাতে তিনি কৌরব পক্ষ ত্যাগ করে নিজের ভাইদের (পান্ডবদের) সাথে যোগ দেন। তিনি বলেন:

·         কর্ণ যদি পাণ্ডব পক্ষে আসেন, তবে তিনিই হবেন জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব এবং যুধিষ্ঠিরের পরিবর্তে তিনিই সম্রাট হবেন।

·         অর্জুন ও কর্ণ মিলে অপরাজিত শক্তিতে পরিণত হবেন।

·         কর্ণের আসল পরিচয় জানলে পাণ্ডবরা তাঁর চরণে মাথা নত করবে।

৩. শ্রীকৃষ্ণের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা

কুন্তীর আগে শ্রীকৃষ্ণও কর্ণকে তাঁর জন্মপরিচয় জানিয়ে পাণ্ডব পক্ষে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কর্ণ তখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

৪. কর্ণের প্রত্যাখ্যান ও যুক্তিসমূহ

মায়ের কাছে নিজের পরিচয় জেনেও কর্ণ পাণ্ডব পক্ষে যেতে অস্বীকার করেন। তাঁর যুক্তিগুলো ছিল অত্যন্ত নীতিগত:

·         কৃতজ্ঞতা ও বন্ধুত্ব: কর্ণ বলেন, যখন সমাজ তাঁকে 'সূতপুত্র' বলে অপমান করত, তখন দুর্যোধনই তাঁকে সম্মান দিয়ে অঙ্গরাজ্যের রাজা করেছিলেন। বিপদের সময় সেই বন্ধুকে ত্যাগ করা হবে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

·         জননীর ভূমিকা: কর্ণ আক্ষেপ করে বলেন যে, জন্মের পর কুন্তী তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন। আজ যখন পাণ্ডবরা বিপদে, তখন তিনি মাতৃত্বের দাবি নিয়ে এসেছেন, যা কর্ণের কাছে স্বার্থপরতা বলে মনে হয়েছে।

·         বীরের ধর্ম: যুদ্ধের মুখে নিজের পক্ষ ত্যাগ করাকে তিনি কাপুরুষতা বলে মনে করেন।

৫. কুন্তীকে দেওয়া কর্ণের বিশেষ কথা

মায়ের কাতর প্রার্থনা একদম বিফলে যেতে দেননি কর্ণ। তিনি কুন্তীকে দুটি প্রতিশ্রুতি দেন:

·         অর্জুন ব্যতিরেকে অন্য পাণ্ডবদের রক্ষা: কর্ণ প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল ও সহদেবকে যুদ্ধে পরাজিত করলেও হত্যা করবেন না।

·         কুন্তীর পাঁচ পুত্রই থাকবে: কর্ণ কুন্তীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—

"মা, যুদ্ধে অর্জুন অথবা আমি—যেকোনো একজন প্রাণ হারাব। তাই তোমার পাঁচ পুত্র (অর্জুন মরলে কর্ণসহ পাঁচজন, আর কর্ণ মরলে অর্জুনসহ পাঁচজন) সবসময়ই জীবিত থাকবে।"

@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।


Post a Comment

0 Comments